ধর্ম অবমাননার নামে গণপিটুনি: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা কোথায় গিয়ে ঠেকছে

সমাজের আইনি এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম আশ্রয়স্থল ধর্ম। কিন্তু যখন সেই ধর্মের নামে একটি উন্মত্ত দল একটি নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করে, তখন ধর্ম আর আইনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশে এমন ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে, এবং সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরব ভূমিকা।

ধর্ম অবমাননা নিয়ে আমাদের সমাজে আগ্রাসী মনোভাব নতুন কিছু নয়। কিন্তু যে বিষয়টি ভয়াবহ তা হচ্ছে, এই মনোভাবের পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিস্ক্রিয় অবস্থান। কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া এক ঘটনায় আমি নিজেই চোখের সামনে দেখেছি কিভাবে একটি নিরীহ মানুষকে ধর্ম অবমাননার অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। ওই সময়টি ছিল ভয়াবহ। আমি দৌড়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মানুষের চোখে উন্মত্ত ক্রোধ দেখতে পাই। কিন্তু পুলিশ তখনও সেখানে পৌঁছেনি। যখন পুলিশ এল, তখন সব শেষ।

এখানে প্রশ্ন আসে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা কেন? এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার একটি জটিল জাল তৈরি হয়েছে, যা এই নীরবতা জারি রাখছে। পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী সত্যিই ধর্মীয় ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করতে চায় না? না কি তারা নিজেরাই অদৃশ্য চাপের মধ্যে থাকে?

বাংলাদেশে পুলিশ প্রশাসন এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর অনেকঠা চাপ থাকে। ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এমন একটি বিষয় যা খুব কম মানুষের ক্ষমতা বা সাহস থাকে তাতে হাত দেয়ার। অনেক সময় আমরা দেখি, স্থানীয় রাজনীতিকরা নিজেদের স্বার্থে এই ধরনের ঘটনায় ইন্ধন জোগায়। এমনকি অনেক পুলিশ কর্মকর্তাও ধর্মীয় উন্মাদনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে সংকোচ বোধ করেন। কারণ তাদের আশঙ্কা থাকে তারা হয়ত নিজেই হয়রানির শিকার হতে পারে।

আরেকটি বিষয় যা গভীর ভাবে চিন্তা করার মতো, তা হচ্ছে এই ধরনের ঘটনা ঘটার পর বিচার ব্যবস্থার অচলাবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখি, অপরাধীরা এদের অপরাধের জন্য দায়ী হয় না। কোনো কঠিন সাজা বা আইনের কঠোর ব্যবহারের অভাবও এই ধরনের ঘটনা বাড়িয়ে তুলছে। যারা আইন ভাঙছে, তারা জানে যে তাদের কেউ ধরবে না, আইন তাদের হাত পর্যন্ত পৌঁছাবে না। ফলাফল স্বরূপ, তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং তাদের অপরাধের মাত্রা আরো বাড়িয়ে তোলে।

আমরা যদি আমাদের সমাজের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো যে ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহারে অনেক মানুষ এমনকি অনিচ্ছুক হয়েও এমন ঘটনায় অংশগ্রহণ করে। কারণ তারা চিন্তাভাবনা করার সুযোগ পায় না, যা করা উচিত তা হলো তাদের নিজস্ব বিবেক এবং নৈতিকতার উপর নির্ভর করে করা।

আমার মতে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি সত্যিই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাহলে এই ধরনের ঘটনাগুলির প্রতি তাদের আরও কঠোর হওয়া উচিত। ধর্মীয় বা অন্য কোনো আবেগকে আর দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এই ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে এবং তাদের নিজেদের ক্ষমতা এবং স্বাধীনতাকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

অন্যদিকে, আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সহানুভূতিশীলতার পাঠ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল থেকে শুরু করে পরিবার পর্যন্ত, প্রতিটি স্থানে এই শিক্ষা দেওয়া উচিত যেন কেউ ধর্মীয় উন্মত্ততার কাছে হার না মানে। আমাদের ধর্মকে আমাদের শান্তির অবস্থায় রাখতে হবে, না যে এই শান্তিকে বিনষ্ট করবে। ধর্মীয় শিক্ষা এমনভাবে দেওয়া উচিত যা মানুষকে সহানুভূতিশীল এবং মানবিক করে তোলে।

তাই আমার মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব সচেতনভাবে পালনে সহায়তা করতে হবে, এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সহানুভূতি এবং সহনশীলতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ধর্ম অবমাননার নামে গণপিটুনিতে যুক্তদের শক্তিশালীভাবে দমন করতে না পারলে, এই নীরবতা একদিন আমাদের সমাজের জন্য এক বড় ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলবে। তাই আমি জানতে চাই, আমরা কি এই নীরবতাকে ভাঙতে পারবো, নাকি আরো কত প্রাণের বিনিময়ে আমাদের এই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে?

By arghya