পহেলা বৈশাখ, আমাদের বাঙালিদের জন্য এক দারুণ চমকপ্রদ এবং আনন্দঘন উৎসব। এদিন বাঙালিরা হয়, তাদের ঐতিহ্যকে চর্চা করে, আনন্দ উৎসবে মাতোয়ারা হয়। ঢাকের শব্দে, বর্ণিল শোভাযাত্রায়, নাচগানে এবং বৈশাখী মেলায় বাঙালি যেন নতুন বছরে নতুন করে পথচলা শুরু করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে কিছু সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, তার মধ্যে একটি হল পহেলা বৈশাখ উদযাপনের আগে কিছু অজানা হুমকি।

২০২২ সালের এপ্রিলে যখন আমরা পহেলা বৈশাখ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক তখনই সামনে আসে কিছু অদ্ভুত সংবাদ। সামাজিক মাধ্যম এবং বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে ছড়িয়ে পড়ে যে, নাচগান বন্ধ না করলে ভালো হবে না, এমন হুমকি পাচ্ছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দল। এমন কথা শুনে প্রথমে আমি একটু অবাক হয়েছিলাম, সত্যিই কি এমন কিছু হতে পারে? তবে সেটা বেশ দ্রুতই বিশ্বাস করলাম যখন কিছু বন্ধুরা আমাকে ঐ একই কথা জানালো। বলতে গেলে, এ যেন আমাদের মত উদযাপনপ্রেমী বাঙালিদের জন্য এক বিশাল ধাক্কা।

বাঙালিরা বিশেষত পহেলা বৈশাখে নাচগান এবং সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে তাদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। নতুন বছরের প্রথম দিনেই আমরা নিজেদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করি, আর এই উদযাপন আমাদের জন্য অনেকটা রিচ্যুয়াল বা আচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু হুমকির এই প্রেক্ষাপটে আমরা কি করব? কতটা সাহস দেখাবো, নাকি ছেড়ে দেব সব? এই প্রশ্নগুলো এই সময়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল মনে।

অনেকেই হয়তো ভাবছেন, পহেলা বৈশাখ আর নাচগান বন্ধ করার হুমকি কেন আসবে? মূলত কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী এবং তাদের সমর্থকদের জন্যই এমন পরিস্থিতির সূত্রপাত। তারা মনে করে, এই উদযাপনগুলো আমাদের সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত নয়। কিন্তু আমি মনে করি, পহেলা বৈশাখের এই উদযাপনগুলো আমাদের ঐতিহ্যের অংশ এবং এটি আমাদের সত্ত্বার সাথে মিশে গেছে।

এতে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির চর্চা থেমে যাবে, এমন ভাবনায় আমি উদ্বিগ্ন হয়েছিলাম। কিভাবে আমরা এর মোকাবিলা করবো, সেটাই ছিল বড় প্রশ্ন। ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, এমন হুমকির মুখে আমরা দমে যাবো না। আমরা সবসময়ই শান্তির পথে থেকে নিজেদের সংস্কৃতিকে ধ্রুবতারা করে রেখেছি। আমাদের উচিত ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই হুমকির মোকাবিলা করা।

এর পরের ঘটনা ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক। আমাদের অনেক সাংস্কৃতিক দল এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ করল। তাদের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, পহেলা বৈশাখ আমাদের ঐতিহ্য এবং আমরা তা উদযাপন করবো। এই প্রতিবাদ আমাদের বুঝিয়ে দিলো যে, আমরা একা না। এমনকি সরকার থেকেও আশ্বাস দেওয়া হয় যাতে কোনো সমস্যা না হয়। এটা আমাদের সাহস বাড়ালো এবং আমরা নতুন উদ্যমে উদযাপনের প্রস্তুতি নিলাম।

এই পরিস্থিতি থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। বিশেষ করে, যখনই আমরা আমাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত কিছু করতে চাই, আমাদের সম্মুখীন হতে হয় বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের। আমাদের শিক্ষা হলো, আমাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হলে আমাদের সজাগ থাকতে হবে এবং প্রয়োজনমতো সংগঠিত হতে হবে। এটি ঠিক যে চ্যালেঞ্জ সবসময় আসবে, কিন্তু আমাদের মনোবল এবং সাহসের জোরে আমরা সেগুলো মোকাবিলা করতে পারবো।

পহেলা বৈশাখের এই হুমকি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। যেমনটা আমরা দেখলাম, আমাদের ঐক্য এবং সাহসই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়, আমরা কি সত্যিই সবসময় এভাবেই এক জোট হয়ে আমাদের সংস্কৃতি রক্ষা করতে পারবো? তাছাড়া, সামনের দিনগুলোতে নতুন কোনো হুমকি আসলে আমরা কি আগের মতো শক্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হবো? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে এবং আমাদের সংস্কৃতিকে আমরা রক্ষা করবো; কারণ এটি আমাদের সত্ত্বার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

By rimjhim