আজকের আলোচনার বিষয়টি একেবারে হৃদয়ের কাছাকাছি, বিশেষ করে যখন আমরা কথা বলি আমাদের সমাজের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির উপর। শিরোনামেই আসল কথা বলে দিয়েছি: গ্রামীণ মেলায় হিন্দু শিল্পীদের বাদ: ধর্মীয় রক্ষণশীলতার জয়ের মাস। এমন একটি ঘটনা যা কেবল ধর্মীয় বৈষম্যের নয়, বরং আমাদের সমাজের অন্তর্নিহিত ভঙ্গুরতারও প্রতিচ্ছবি।

আমাদের গ্রামীণ মেলা, যা প্রায়ই বিদেশি পর্যটকদের চোখে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, সেখানে হিন্দু শিল্পীদের বাদ দেওয়ার ঘটনা শুনে আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। এই মেলাগুলো আমাদের সমাজের মেলবন্ধনের প্রতীক হওয়ার কথা। এখানে ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে, আমরা সবাই একসাথে আনন্দে মেতে উঠি। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বাদ দেওয়া হলে সেই আনন্দেরই বা কি মানে থাকে?

মেলায় হিন্দু শিল্পীদের অনুপস্থিতি মোটেই কাকতালীয় নয়। যেসব মেলায় হিন্দু শিল্পীরা তাদের সৃজনশীলতা এবং দক্ষতা প্রদর্শন করে আসছে, সেখানে তাঁদের বাদ পড়া আসলে আমাদের সমাজের আভ্যন্তরীণ সংকটকে প্রকট করে তুলছে। এটি ধর্মীয় বৈষম্যের একটি এমন প্রতিফলন যা খুবই বিব্রতকর। এই ঘটনাটি শুধু হিন্দু সম্প্রদায় নয়, বরং পুরো জাতির জন্যই একটি অশনি সংকেত।

আপনি যদি একটি গ্রামীণ মেলায় যান, সেখানে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকলা দেখতে পাবেন, যেমন পালাগান, যাত্রাপালা, লোকগান ইত্যাদি। এগুলো আমাদের দেশের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিন্দু শিল্পীদের অবদান এখানে অস্বীকার করা যায় না। তাদের বাদ দেওয়ার অর্থ শুধু তাদের সৃজনশীলতাকে নয়, একটি বিশাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও উপেক্ষা করা।

একবার এক গ্রামীণ মেলায় গিয়ে দেখেছিলাম, একটি গ্রুপ খুব সুন্দর করে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম; তখন আমার পাশের একজন জনাব বললেন, এরা তো হিন্দু, এরা যা গায় সব কিছু ভালো হবে নাকি? আমি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম। সমাজের এই স্থূল দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনের গভীরে বসে আছে।

এই ধরনের ধর্মীয় রক্ষণশীলতা আমাদের সমাজকে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিজয় তখনই পূর্ণ হয় যখন সব সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথচলা করে। কিন্তু যদি আমাদের সমাজই একজন শিল্পীর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সংকীর্ণ হয়ে যায়, তবে সেই বিজয়ের বা কি মানে থাকে? বিশেষ করে বাংলাদেশ যেখানে পূর্ণ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেখানে এমন ঘটনা আমাদের আত্মপরিচয় এবং স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে।

আমাদের শিশুদের আমরা কি শিক্ষা দিচ্ছি? ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং বৈচিত্র্যের মূল্য তাদের কাছে কি আমরা পৌছে দিতে পারছি? ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে আমাদের কি বার্তা রেখে যাচ্ছি? একটি সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে কি আমরা সত্যি inclusive সমাজ গঠন করতে পারবো?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আমাদের কাছে না থাকে, তবে আমাদের আত্ম-অনুসন্ধান জরুরি। এমনকি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও এতে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের উচিত এই ধরনের বৈষম্যমূলক ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া এবং সবার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নিশ্চিত করা।

এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমাদের উচিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সেইসঙ্গে নিজেদের সংস্কৃতির ঐতিহ্যকেও গুরুত্বের সঙ্গে ধারণ করা। আমরা যদি গ্রামীণ মেলার মতো একটি প্রাঙ্গণে হিন্দু শিল্পীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারি, তবে সেই মেলা কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। নিজেদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের অবশ্যই সকল সম্প্রদায়ের প্রতি সহিষ্ণু হতে হবে এবং সবার অবদানকে মূল্যায়িত করতে হবে।

আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি এমন সমাজ গড়ে তুলি যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানবিকতা বেশি গুরুত্ব পায়। যেখানে হিন্দু শিল্পীই হোক বা মুসলিম, সবার প্রতিভার সম্মান থাকবে এবং সবার জন্য একইভাবে দরজা খোলা থাকবে। এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। সমাজের সকল স্তরে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি নতুন সূর্যের আলোয় নিজেদের গড়ে তুলতে পারে।