বাংলাদেশে দুর্গাপূজা মানে এক নতুন আলোয় ফেলা গল্প। বছরের পর বছর ধরে দুর্গাপূজার সময়টা আমি বুক ভরে উপভোগ করেছি। আমার মনে আছে ছোটবেলায় যখন এক বন্ধুর সাথে মণ্ডপে গিয়েছিলাম, তখন কী অপূর্ব রঙের আভা জেগে উঠেছিল চারপাশে। কিন্তু এর মাঝে একটা বিষণ্ণতা ছিল যা আমি তখন বুঝিনি। বড়দের মধ্যে একটা নীরব দুশ্চিন্তা ভেসে বেড়াত। প্রতিবছর পূজার সময় আসলেই সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজনের মুখে একটা অদ্ভুত নীরব প্রার্থনা ফুটে ওঠে: ‘এবার যেন কিছু না হয়’।
বছরের পর বছর ধরে এই প্রার্থনা কেন জানি না সবার ভেতর একরকমের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এবার যেন কিছু না হয় কথাটা এমনই একটা সহজ বাক্য, কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে অনেক গভীর বেদনা। আসলে, এর পিছনে লুকিয়ে থাকে নানান অতীত অভিজ্ঞতা, যা শুধুমাত্র ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারেন। পূজার সময় যখন বাংলাদেশের সব ক’টা মণ্ডপ আলো ঝলমল করে, তখন অনেকের মনেই দুশ্চিন্তার কালো ছায়া ভেসে থাকে। এক বিশেষ কারণে যেটা হয়তো আমরা খোলামেলাভাবে স্বীকার করতে চাই না।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন অনেক ক্ষণ রয়েছে যখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এই নির্যাতন শুধু শারীরিকভাবে নয়, এর সাথে মানসিকভাবেও তারা বিদ্ধ হয়েছে। প্রতিবার যখন পূজার ঢাকের আওয়াজ কানে আসে, তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে এইবার হোক না এক শান্তিপূর্ণ পূজা। আমাদের এই আশা কী এতটাই বড় যে তা বাস্তবায়ন অসম্ভব?
পূজার ছুটির সময়টায় আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার খবর মাঝেমধ্যেই উঠে আসে। পত্রিকার পাতায়, নিউজফিডে সবখানে শিরোনাম হয়ে যায়। এমনকি, অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনকে বাড়তি সময় দিতে হয়। এটা খুবই দুঃখজনক যে আমাদের সমাজের একটা অংশ সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকতে বাধ্য হয়।
আমার এক বন্ধু, যে হিন্দু সম্প্রদায়ের, প্রায়ই বলতো, ‘আমরা কখনো জানি না কী হতে যাচ্ছে।’ তার কথায় হতাশা ছিল, ছিল একটা অদ্ভুত নীরবতা। আমি বুঝতে পারি তার মনের কথা, কিন্তু কীভাবে এই ভয়টা দূর করা যায়? এটি কি শুধুমাত্র প্রশাসনের উপরই নির্ভর করে? নাকি আমাদের সবার উচিত হাত বাড়ানো এবং সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানো?
বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে গর্ব করে। আমাদের ইতিহাসে আমরা অনেক সংগ্রাম করেছি এই পরিচয় ধরে রাখার জন্য। কিন্তু সংখ্যালঘুদের প্রতি এই বঞ্চনা কি আমাদের সেই গর্বিত পরিচয়কে লজ্জায় ফেলছে না? আমাদের উচিত সেই ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের অনুভূতি বুঝতে চেষ্টা করা। এমন একটি সমাজ তৈরি করতে হবে যেখানে আমরা সবাই সমান, সবাই নিরাপদ।
পূজার সময় সংখ্যালঘুদের সেই নীরব প্রার্থনাকে আমাদের কানে শোনা উচিত। তাদের কষ্টের কথা শুনে আমাদের উপলব্ধি করা উচিত যে, এই সময়টা তাদের জন্য কতটা চাপের হতে পারে। আমাদের উচিত তাদের সাথে কথা বলা, তাদের ভয় দূর করার চেষ্টা করা। আমাদের উচিত নিজেদের হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং এই সমাজকে আরো মানবিক করে তোলা।
অন্যদিকে, আমাদের প্রশাসনেরও উচিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যাতে আমাদের কোনো ভাই বা বোন পূজার আনন্দে বাধা পেতে না হয়। তাদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
ফলত, আমাদের সকলেরই উচিত এই বিপদমুক্ত পূজা নিশ্চিত করা, যা শুধুমাত্র প্রশাসনের হাতেই নয়, আমাদের সবার হাতেই রয়েছে। আমরা যদি আমাদের মন থেকে সকল প্রকার ধর্মীয় বিভাজন দূর করতে পারি, তবে শুধুমাত্র সংখ্যালঘুরাই নয়, সকলেই একসাথে পূজার আনন্দ ভোগ করতে পারবে। সেই দিনই হবে পূজার সার্থকতা।
তাহলে আসুন, আমরা সবাই মিলে এই বছরের পূজাকে করি শান্তির, নিরাপত্তার এবং সমতার প্রতীক। আসুন আমরা সবাই মিলে হাত বাড়াই, পাশে দাঁড়াই এবং বলি ‘এইবার কিছু হবে না, এইবার হবে শুধুই শান্তি।’ আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাই পারে আমাদের এই সমাজকে বদলে দিতে। আমাদের উচিত চেষ্টা করা, যাতে পূজার সময় সংখ্যালঘুদের সেই নীরব প্রার্থনায় আর কোনো ভয় না থাকে। আমরা কি সে চেষ্টাটা করবো না?
