নভেম্বরের শুরুতেই বাংলাদেশের মাটিতে যখন এমন একটি ঘটনা ঘটে যেখানে মূর্তি ভাঙার মতো সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক আঘাত ঘটে, তখন আমাদের সমাজের ভিতরকার বহু প্রশ্ন জেগে ওঠে। এ কি শুধুই অবমাননা, নাকি এর পেছনে আছে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র? রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া যেন আমাদের হকচকিয়ে দিল। ভাবতে বাধ্য করে, আমরা কি সত্যিই স্বাধীন আর সভ্য একটি সমাজের অংশ?
যখন একটি জাতি তার মূর্তিদের সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়, তখন বুঝতে হবে জাতির সংস্কৃতি আর ইতিহাস হুমকির মুখে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মূর্তি ভাঙার ঘটনা তেমনই একটি সতর্ক বার্তা। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেটুকু প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে, তা একেবারে ‘দুঃখজনক’ এবং যা হবার ছিল তার চেয়ে অনেক কম। অথচ আমাদের উচিত ছিল এই ঘটনাগুলোর তীব্র নিন্দা জানানো এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা। কিন্তু আমরা দেখেছি, রাষ্ট্র এটাকে শুধুমাত্র ‘দুঃখজনক’ বলে এড়িয়ে যায়, যেন এটি একটি সাধারণ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
মূর্তি ভাঙা শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, এটি একটি জাতীয় অপমান। যারা এই ধরণের কাজ করেছে তাদের মনের মধ্যে কোন বিদ্বেষ বাসা বেঁধেছে তা আমাদের গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন। আমাদের দেশের একটি বড় অংশ এখনও মূর্তি আর তাদের গুরুত্বের ব্যাপারে অজ্ঞ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি ব্যর্থ হয়েছে তাদের এই সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দিতে? নাকি এর পেছনে আছে কোনো ধর্মীয় উগ্রতা যা আমাদের বিভক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
রাষ্ট্রের তরফ থেকে যে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, তা হলো ‘তদন্ত চলমান’। কিন্তু প্রায়শই আমরা দেখি, এসব তদন্তের শেষ কোথাও গিয়ে দাঁড়ায় না। তদন্তের নামে শুধুমাত্র সময় পার করে দেয়া হয়, যাতে জনসাধারণের মনোযোগ অন্য দিকে সরে যায়। আমরা কি সত্যিই এই ধরনের লক্ষণীয় ঘটনা থেকে শিক্ষা নিই? আমরা কি এমন একটি সমাজে বাস করতে চাই যেখানে অপরাধীরা আড়াল পেয়ে যায় এবং তাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ব্যবস্থা নেয়া হয় না?
আমাদের সামনে এখন দুটি পথ। প্রথমত, আমরা যদি সত্যিই একটি সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ সমাজ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, তবে আমাদের এই ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের উচিত এসবের বিরুদ্ধে কথা বলা, সামাজিক মাধ্যমে কিংবা যেকোনো ফোরামে। আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মূর্তি ভাঙার সাহস না পায়।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের উচিত এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যে বিবৃতি দিয়ে তারা নিশ্চিন্ত করবার চেষ্টা করছেন, তা কিন্তু যথেষ্ট নয়। আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উচিত কঠোরভাবে তদন্ত চালানো এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা। যেকোনো রকম দুর্নীতি কিংবা প্রভাবমুক্ত থেকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করা উচিত।
আমাদের স্মরণ রাখা দরকার, মূর্তি শুধু পাথর কিংবা ধাতুর তৈরি নয়। তারা আমাদের ইতিহাসের অংশ, আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি। তাদের ক্ষতি মানে আমাদের সংস্কৃতির ক্ষতি। এ ধরনের আঘাত মেনে নেওয়া মানে আমাদের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। রাষ্ট্রের উচিৎ এই বার্তা পাঠানো যে, এ ধরণের অপরাধ কোনভাবেই বরদাশত করা হবে না।
নভেম্বরের এই ঘটনা যেন আমাদের জন্য একটি জাগরণ। এটি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমরা কোন পথে হাঁটছি। আমরা কি সত্যিই একটি সুষ্ঠু সমাজ গঠন করতে পারছি, নাকি আমাদের উন্নয়নের গল্প কেবল কাগজে লেখা থেকে যাবে?
শেষমেশ, এমন ঘটনা যখন ঘটছে তখন আমাদের উচিত নিজেদের দিকে তাকানো। আমরা কতটুকু সচেতন? কতটুকু শিক্ষিত? আমাদের প্রতিক্রিয়া কি শুধু ‘দুঃখজনক’ বলেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আমরা এর বিরুদ্ধে কার্যকর কিছু করব? আপনার মতামত কি? আমরা কি সত্যিই আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় সচেষ্ট হচ্ছি? নাকি কেবলই ‘তদন্ত চলমান’ বলে নিজেদের সন্তুষ্ট রাখছি?
