### গ্রামীণ মেলায় হিন্দু শিল্পীদের বাদ দেওয়া, মুসলিম শিল্পীদের ওপরও চাপ
বাংলাদেশের গ্রামীন মেলা মানেই একটি প্রাণচাঞ্চল্যময় পরিবেশ, যেখানে কেবল খেলা-ধুলা বা ক্রয়-বিক্রয় নয়, বরং সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের মিশ্রণ ঘটে। আমি নিজে ছোটবেলায় এমন অনেক মেলা দেখেছি যেখানে হিন্দু, মুসলিম সহ সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে কাজ করতো। কিন্তু কালক্রমে আমাদের এই মেলায় যেন এক অদৃশ্য পরিবর্তন এসেছে, যা হৃদয়কে কষ্ট দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে মিডিয়াতে একটি খবর ভাইরাল হয়েছিল গ্রামীন মেলায় হিন্দু শিল্পীদের বাদ দেওয়া হয়, আর মুসলিম শিল্পীদের ওপরও নানা রকম চাপ সৃষ্টি করা হয়। খবরটি পড়ে আমি ছোটবেলার সেই প্রাণবন্ত দিনগুলোকে স্মরণ করলাম, যখন আমরা সমান অধিকার নিয়ে একসাথে দোলায় উঠতাম, গান শুনতাম আর মজার মজার পণ্য কিনতাম। সেই দিনগুলো কি এখন শুধুই স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে?
আজকের মেলাগুলি অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। নানা কারণে ভারতীয় বাংলা সিনেমা বা হিন্দি বলিউডের গান শুনিয়ে, আর নবীন প্রজন্মের সঙ্গীতশিল্পীদের নিয়ে মেলার আয়োজন করা হয়। সেখানেও আবার ধর্মীয় এবং সামাজিক বৈষম্য ফুটে ওঠে। এই বৈষম্যই যেন আমাদের সব আনন্দকে গিলে নিচ্ছে।
হিন্দু শিল্পীদের বাদ দেওয়ার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে? এ প্রশ্নটি আমার মনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলে। আমি বিশ্বাস করি, এদেশের জেনারেশনদের মধ্যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবোধ থাকা উচিত নয়। আমরা এক জাতি হিসেবে গর্বিত হতে চাই, যেখানে সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে একসাথে বসবাস করতে পারে। কিন্তু যখন দেখি হিন্দু শিল্পীদের বাদ দেওয়া হচ্ছে, তখন মনে হয় সমাজের একাংশ এখনও সেই প্রাচীন ভেদাভেদ ধারণ করে রাখতে চায়। এটি আমাদের ঐক্যবদ্ধ সমাজের লক্ষ্যের বিরোধী।
অন্যদিকে, মুসলিম শিল্পীদের ওপরও নানা রকম চাপ সৃষ্টি করা হয়। কারণ তাদেরকে বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক ইস্যুর মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় তাদের শিল্প ও সংস্কৃতি প্রদর্শনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। ধর্মীয় নেতারা বিভিন্ন সময়ে তাঁদেরকে নানা রকম বিধি-নিষেধের বন্দীতে ফেলে দেয়। এই বন্ধনী থেকে মুক্তি পেতে তারা অনেক সময় নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য হয়।
যে শিল্পীরা মেলায় অংশগ্রহণ করতে না পারেন, তাঁদের জন্য এটা শুধুই আর্থিক ক্ষতির ব্যাপার নয়, বরং সাংস্কৃতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়। তাদের শিল্প আমাদের সমাজের অঙ্গ, যা আমাদের ঐতিহ্যকে জীবিত রাখে। এই শিল্পীরা সারা বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করে, নতুন নতুন সৃষ্টিতে নিজেদের মনোনিবেশ করেন এবং তাঁদের প্রতিভার মাধ্যমে মেলায় অংশগ্রহণ করে নিজেদের সুনাম অর্জন করে থাকেন। কিন্তু যখন তাঁদেরকে মেলায় অংশগ্রহণ করতে বাধা দেওয়া হয়, তখন তা সত্যিই দুঃখজনক।
আমাদের উচিত হবে সমাজের এই বৈষম্যমূলক মানসিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। ধর্মীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে আমাদের। আমরা যদি সত্যিকার অর্থে একে অপরকে সম্মান করতে না পারি, তবে কিভাবে আমরা দেশের উন্নয়ন করতে পারব? আমাদের সকলের উচিত এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা এবং যে কোনো ধরণের বৈষম্যকে প্রত্যাখ্যান করা। সব ধর্মের শিল্পীদের সমান সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশকে আরও সুন্দর এবং সহনশীল সমাজ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তন কিভাবে আসতে পারে? এর উত্তর সহজ। আমাদের সবাইকে নিজ নিজ ধ্যান-ধারণা পরিবর্তন করতে হবে এবং নিজেদের মধ্যে মানবিকতার নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে। এই বৈষম্য দূর করতে হলে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সুধীজনদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সংবর্ধনার মাধ্যমে এবং গণমাধ্যমের সাহায্যে আমরা সবাই মিলে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি।
শেষ কথা হলো, ধর্মীয় ভেদাভেদের চেয়ে আমাদের ঐক্যের গল্পই হোক আমাদের পরিচয়। মেলায় এসে মানুষ যেন নিজেদের সংস্কৃতি উপভোগ করতে পারে, সেই পরিবেশই তৈরি করতে হবে। হিন্দু-মুসলিম উভয় শিল্পীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। যদি আমরা আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে পারি, তাহলে হয়তো একদিন আমরা বলতে পারব, ‘আমরা এক। আমাদের কোন ভেদাভেদ নেই। আমরা সবাই সমান।’
