লোকজ উৎসবের ওপর হামলা, পুলিশের ভাষায় ‘ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা’

এপ্রিলের এক সন্ধ্যায় যখন ঢাকার বুকে বসন্তের ফুলেল হাওয়া বইছে, তখন পাড়া-মহল্লায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছিলো উৎসবের আমেজ। চৈত্র সংক্রান্তি, বাঁশি-ডোরা এবং হালখাতা, এই তিনটি উৎসবই যেন আমাদের সাংস্কৃতিক ধারার মধ্যে এমনভাবে মিশে আছে যে, আমরা না চাইলেও মনে মনে এর রেশ ধরে রাখি। সারা বছর আমরা কত অক্লান্ত পরিশ্রম করি, তার শেষে এই ছোট্ট উৎসবগুলো যেন আমাদের জন্য এক অভ্যর্থনা, এক পুনর্বিবেচনা। কিন্তু সেই শান্তির আশ্রয়ে যখন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো কিছু ঘটে যায়, তখন আমাদের চোখ-কান সজাগ হয়ে যায়।

সম্প্রতি এমনই এক ঘটনায় পুরো শহর নাড়া খেয়ে উঠেছিল, যখন এক লোকজ উৎসবের ওপর হামলা হলো। ঘটনাস্থলে হাজির পুলিশ কর্মকর্তারা একে ‘ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা’ বলে অভিহিত করলেও, যারা সেখানে ছিলেন তাদের জন্য এটি একটি আতঙ্কের রাত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই ঘটনা আমাদেরকে কতটুকু নাড়া দিলো, তা বোঝার জন্য আমাদের একটু গভীরে ঢুকে দেখা দরকার। এখানে শুধু এটুকু বললেই চলে না যে, এ ধরনের ঘটনা পরবর্তী সময়ে কী প্রভাব ফেলতে পারে বা এর পেছনের কারণ কী।

আমরা যদি একটু পিছনে ফিরে যাই, তাহলে দেখতে পাবো যে, আমাদের লোকজ উৎসবগুলো সবসময়ই একধরনের ঐক্যতান সৃষ্টি করে। স্থানীয় লোকদের মাথার ওপর যখন আশীর্বাদের ছায়ের মতো এই উৎসবগুলো নেমে আসে, তখন এত সহজে কিছুরা এসে সেই আনন্দ ম্লান করে দিতে পারে না। কিন্তু বর্তমান সময়ে যখন সমাজের নানা অংশে বিভাজন দেখা যাচ্ছে, তখন এ ধরনের ঘটনা যেন আরও বেশি করে আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে যেই প্রতিক্রিয়া আসে, সেটি বেশ চিন্তাশীল। তারা নিশ্চয়ই এ বিষয়টিকে ছোটখাটো বিষয় হিসেবে দেখতে পারবে না। এই ধরনের মন্তব্য প্রায়শই সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আরও উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। কারণ একটি উৎসব শুধু মানুষকে আনন্দ দেয় না, এটি স্থানীয় সংস্কৃতির একটি অংশ হিসেবে জনগণকে একত্রিত করে, একাত্ম করে। যখন সেই উৎসবে এ ধরনের হামলা হয়, তখন সেটা শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে না, তার প্রভাব সমাজের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ে।

এটি ভাবার সময় এসেছে যে, আমরা যেসব লোকজ উৎসব পালন করি, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেমন করে সম্ভব? আমরা কি আমাদের সন্তানের প্রতি এমন একটি সমাজ রেখে যাচ্ছি যেখানে তারা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ঐতিহ্য পালন করতে পারবে? নাকি আমরা শুধুমাত্র প্রতিটি ঘটনা ঘটার পর তা নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেই ক্ষান্ত হবো?

আমাদের উচিত এই ধরনের ঘটনার পর শুধু পুলিশ এবং প্রশাসনের ওপর দোষারোপ না করে নিজেদেরও কিছুটা দায়িত্বশীল হয়ে ওঠা। এমন অনেক কিছুই আছে যেখানে আমরা নিজেদের ভূমিকা পালন করে পরিস্থিতি ভালো করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, উৎসবের সময়ে সুশৃঙ্খলতা বজায় রাখার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় সমাজের নেতৃবৃন্দকেও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ সমাজের নেতারা সাধারণ মানুষের সাথে নিজেকে অনেক বেশি যুক্ত করতে পারে, তাদের কথা শুনতে পারে, তাদের উদ্বেগকে তুলে ধরতে পারে।

তবে আমাদের সমাজের যেসব দূর্বলতা রয়েছে, তার সঠিকভাবে মূল্যায়ন করাও জরুরি। কেন এমন ঘটনা ঘটছে? সমাজে আজকের দিনে কেন এতোটা অস্থিরতা, কেন আমরা একে অপরকে সহজভাবে নিতে পারছি না? এখানে ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, রাজনৈতিক মনোভাব এসবকিছুই যে কোনো সময়ে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। আর এইসব সমস্যা সমাধান করতে হলে আমাদের সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে।

প্রতিটি উৎসবের আলাদা একটি সৌন্দর্য রয়েছে, যা আমাদের আত্মার সাথে লেগে থাকে। আমাদের সেই সৌন্দর্য রক্ষা করার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই। পুলিশের বা প্রশাসনের ওপর সবকিছু চাপিয়ে দেওয়া আমাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য উপযুক্ত হবে না। আমাদের নিজেদেরও এই দায়িত্ব নিতে হবে এবং সঠিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে চলতে হবে। পুলিশ প্রশাসনকেও আমাদের অনুভূতি এবং সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়ে আরও সংবেদনশীল হতে হবে।

অবশেষে, প্রশ্ন থেকে যায় এই ধরনের ঘটনার পর আমরা কতটা পরিবর্তিত হব? আমাদের মধ্যে কি আদৌ কোনো পরিবর্তন হবে? নাকি আমরা সেই পুরনো অভ্যাসে ফিরে যাবো, যেখানে শুধু ঘটনা ঘটলে দুঃখপ্রকাশ করাই যথেষ্ট মনে হয়? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ একটি সমাজ গড়ে তুলতে হলে আমাদের কিন্তু সেই চক্র ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। আর সেই চক্র ভাঙার কাজ এখন থেকেই শুরু করা উচিত। আপনাদের কী মনে হয়? আমরা কি পারবো সেই চক্র ভেঙে আমাদের উৎসবগুলোকে আরও আনন্দময় এবং নিরাপদ করতে? আমি আশা করি আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই দিনটি দূরে নয়।

By hritik