বাংলাদেশের একেকটা উৎসব যেন একেকটি কোলাহলপূর্ণ মেলা। মানবসমুদ্রের ভেতর ঢেউয়ের মতো ভেসে আসে আনন্দ আর উল্লাসের সুর। কিন্তু সেই সুরের ভেতর কি শুধুই আনন্দ বাজে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একবার চলুন যাই দুর্গাপূজার সময়ের বাংলাদেশে। হ্যাঁ, দুর্গাপূজা, যা কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উৎসব নয়, বরং সারাদেশের মানুষের এক মিলনমেলা। মন্ডপে মন্ডপে কোলাহলরত মানুষ, বাজনার আওয়াজ আর নানা ধরনের রঙিন আলো যেন এই দেশটার সব দুঃখকে কিছু মুহূর্তের জন্য ছাপিয়ে যায়। কিন্তু সেই সব আনন্দের জৌলুসের ভেতর লুকিয়ে থাকে অন্য এক বাস্তবতা।
কিছুদিন আগেই দুর্গাপূজার সময়ে আমরা দেখলাম মন্ডপে মন্ডপে ব্যারিকেড। সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার তারা যেন একটা অদৃশ্য ভয়ের পাহারাদার হয়ে উপস্থিত। কেন এই অতিরিক্ত নিরাপত্তা? কেন আনন্দমুখর দিনগুলোতে এতটা সতর্কতা? এ সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সমাজের এক গভীর অন্ধকারের দিকে তাকাতে হবে।
দুর্গাপূজার সময় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের খবর নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই কোন না কোনভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা, মন্দিরে ভাঙচুর বা মন্ডপে আক্রমণের মত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাগুলো যেন আমাদের সভ্য সমাজের উজ্জ্বল মুখোশের নিচে লুকিয়ে থাকা এক কালো দাগ। এই অনুষ্ঠানের সময় আমরা যেন চলন্ত আগ্নেয়গিরির উপরে নাচি। একটু অসতর্ক হলেই সেই আগ্নেয়গিরি ভয়ঙ্করভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে।
মন্ডপে ব্যারিকেড বসানোর মাধ্যমে সরকার হয়তো এক ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, কিন্তু কি আদৌ আমরা সমস্যার সমাধান করছি? মূল সমস্যাটা তো অন্যত্র! সমস্যার মূলে রয়েছে সামাজিক বৈষম্য, ধর্মান্ধতা এবং বিচারহীনতা। সরকার প্রতি বছরই বিভিন্ন আশ্বাস দেয় এবং নিরাপত্তা জোরদারের ঘোষণা করে। প্রতি বছরই আমরা দেখি বিভিন্ন বাহিনী রাতদিন টহল দিচ্ছে মন্ডপের আশেপাশে। কিন্তু নিরাপত্তার সেই বাহুল্য আয়োজন কি আদৌ ন্যায়বিচারের অভাব পূরণ করতে পারে?
কথা হলো, আমাদের দেশে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো যে দুর্গাপূজার সময়ে সেনাবাহিনী নামাতে হয়? সমস্যার গোড়ায় হাত না দিয়ে আমরা কি কেবল গোঁড়ায় জল ঢালছি না? ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অভাব যে কী পরিমাণে গভীর তা আমাদের বুঝতে হবে। সমাজে নির্যাতনের শিকার হওয়া সংখ্যালঘু পরিবারগুলো বছরের পর বছর ধরে সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতির সাথেই বসবাস করে। এই বেদনা আমরা কি কখনও তাদের কাছে গিয়ে বুঝতে পারি?
সমাধান কিন্তু সহজ। এটি একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সামাজিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে অর্জন করতে হবে। শিক্ষার প্রসার, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেওয়া ছাড়া সমস্যার মূল সমাধান সম্ভব না। আমরা যদি স্কুল-কলেজে শিশুদের মধ্যে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা করতে পারি, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে একদিন এই দৃশ্যপট পরিবর্তন করা সম্ভব।
আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সচেতন ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে যাতে কোন অপরাধী ধর্মীয় সহিংসতার সুযোগ না পায়। প্রতিটি অপরাধের দ্রুত বিচার ও শাস্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। যে দেশে অপরাধীরা বিচারের বাইরে থাকে, সেই দেশে শৃঙ্খলা ও শান্তি কখনই সুদৃঢ় হতে পারে না।
আরো একটি বিষয় হলো, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সৎ উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা তাদের স্বার্থের জন্য ধর্মীয় ভেদাভেদ সৃষ্টি না করার বিষয়ে সচেষ্ট হোন। নেতাদের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা, বিভেদ নয়।
আমাদের দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি বাড়াতে হবে। অন্যের উৎসবে আমাদের অংশগ্রহণ একে অপরের প্রতি একধরনের বন্ধন তৈরি করে। প্রয়োজনে আমাদের হতে হবে শক্তিশালী কথোপকথনের প্ল্যাটফর্ম, যেখানে প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের কথা শুনবে এবং পারস্পরিক সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবে।
দুর্গাপূজার মতো উৎসবে ব্যারিকেড, সেনা-পুলিশ মোতায়েন এ সব প্রয়োজন হচ্ছে কেন? এ সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নিজেদের মধ্যে অনেক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু সেই প্রশ্নগুলোকে এড়িয়েই যদি আমরা নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে চলি, তবে কোনদিনই ন্যায়বিচারের আলো আমাদের সমাজের সব অন্ধকার দূর করতে পারবে না।
শেষে এই কথাটিই বলতে চাই, যখন আমরা মন্ডপের আলো আর আনন্দে মগ্ন হই, তখন যেন সেই আলো আমাদের মানবতার, সাম্যের পথে আলোকিত করে। আশা করি, একদিন আমাদের সমাজে সেই আলোই জ্বলে উঠবে, যেখানে ব্যারিকেড বা নিরাপত্তা বাহিনীর প্রয়োজন হবে না; বরং থাকবে শুধুই একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। ইতিবাচক পরিবর্তনের এই যাত্রায় আমরা সকলে একসাথে চললে হয়তো সত্যিই সমাজে ন্যায়বিচারের আলো দেখা যাবে। তোমরা কি এই পরিবর্তনে অংশ হতে ইচ্ছুক?
