**পূজার সময় ‘ছোটখাটো’ হামলাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে চালিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি**
বাংলাদেশের পূজা উৎসবের দিনগুলোতে আমরা যেন আরেকটা দেশের মধ্যে চলে যাই। চারপাশে আলোর রোশনাই, ঢাকের বাদ্য, প্যান্ডেলের ভিড় আর মানুষের উচ্ছ্বাস, সব মিলিয়ে যেন একদম অন্যরকম এক পৃথিবী। কিন্তু এই পৃথিবীতে যে অন্ধকারের ছায়া পড়তে পারে, তা হয়তো আমরা মনের কোণে এসে জমা করি না। কারণ, আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করি যেখানে অনেক কিছুই ঘটে যাচ্ছে, যার মধ্যে কিছু ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, কিন্তু আমরা সেগুলোকে ‘ছোটখাটো’ বলতে পছন্দ করি। বিশেষ করে যখন পূজার সময় কোনো হামলার ঘটনা ঘটে, তখন আমরা একটা অদ্ভুত প্রচলিত ন্যারেটিভে আটকে যাই। সমস্যাটা কী জানেন? আমরা এসব ঘটনাকে প্রায়শই ‘স্বাভাবিক’ বলে চালিয়ে দিই।
বাংলাদেশে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেকেই গর্বে বুক ফুলিয়ে বলেন, আমাদের দেশে সবাই মিলেমিশে থাকে, এখানে কোনও ধর্মীয় বিদ্বেষ নেই। এটা সত্য যে বাংলাদেশের বৃহত্তর অংশে মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করে। কিন্তু কিছু ঘটনাকে এড়িয়ে যাওয়াও তো এক প্রকার সমস্যা। পূজার সময় কিছু লোকজন ইচ্ছে করেই বিভিন্ন ধরনের অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়। আমাদের সমাজে কিছুটা হলেও একটি প্রচলিত ধারণা তৈরি হয়েছে যে পূজার সময় কিছু ‘ছোটখাটো’ ঘটনা ঘটবেই, সেটা যেন একপ্রকার পূজার উৎসবের অংশ হয়ে গিয়েছে। আর এই ধারণাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি, আমি ঢাকার এক এলাকার দুর্গাপূজায় অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে দেখলাম, কিছু যুবক নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে প্যান্ডেলের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। তাদের মুখভঙ্গি কিংবা আচরণ সব কিছুই ছিল সন্দেহজনক, যেন কিছু একটা করার অপেক্ষায়। আমি নিজে হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধু এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে জানালাম, কিন্তু তারা বললেন, ‘আরে, এসব তো পূজার সময় হয়েই থাকে। এ নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই’। এই ধরনের মানসিকতা কি সত্যিই ঠিক?
আমরা কেন এসব ঘটনাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেই? একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমরা কেন এমনভাবে ভাবতে শুরু করি যে কিছু ছোটখাটো হামলা বা উত্তেজনা থাকবেই? এর পেছনে কি আমাদের ভীতি কাজ করে, নাকি আমাদের উদাসীনতা? আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করি যে, এভাবে এসব ঘটনা ধামাচাপা দিলে তা আর কখনও ঘটবে না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নিজেদের দিকেই তাকাতে হবে। আমরা কি সচেতনভাবে এসব ঘটনার বিরুদ্ধে কথা বলি, নাকি সমাজে প্রচলিত ধারণার পেছনে নিজেকে লুকিয়ে রাখি?
বাংলাদেশের সুষ্ঠু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে গিয়ে আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে একটি দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে হবে। পূজার সময় ‘ছোটখাটো’ হামলাকে স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কেননা, এসব ছোটখাটো বিষয় আসলে ছোটখাটো নয়। এগুলো আমাদের সমাজের গভীরে থাকা সমস্যার আভাস। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে আমাদের সবার আগে মনোভাব পরিবর্তনে মনোযোগ দিতে হবে।
উপায় কী হতে পারে? প্রথমত, আমাদের সকলের প্রয়োজন সঠিক শিক্ষা এবং সচেতনতা। আমরা যারা পূজায় অংশ নিই, তাদের বুঝতে হবে যে পূজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের সবার অংশগ্রহণের একটি প্ল্যাটফর্ম। দ্বিতীয়ত, সামাজিক সংহতি গড়ে তোলা। যেখানে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা আর সামাজিক বন্ধনকে আমরা প্রকৃতপক্ষে গুরুত্ব দেব। আর তৃতীয়ত, প্রশাসনিক উদ্যোগ। যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশাসনকে সবসময় সচেতন থাকতে হবে। কোনো ছোটখাটো ঘটনা ঘটলে সেটিকে তাত্ক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই লেখার মাধ্যমে আমি একটি প্রশ্ন রেখে যাই আমরা কি আমাদের সমাজকে এমন একটি প্লাটফর্মে পরিণত করতে পারব, যেখানে পূজা শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব না হয়ে, আমাদের সবার মিলনমেলার উৎসবে পরিণত হবে? যেখানে ছোটখাটো কোনো ঘটনাও আমাদের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারবে না? আপনি কী ভাবছেন?
