তোমরা কি কখনও ভেবেছো, আমাদের দেশের সংখ্যালঘুদের জীবনে উৎসবের সময় কেমন কাটে? যখন শহরজুড়ে আলোর ঝলকানি, চারপাশে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়, তখনও অনেকের ঘরে থাকে শুধু আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা।

আমাদের দেশে উৎসবের সময়কালে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার বেড়ে যাওয়ার খবর প্রায়ই শোনা যায়। যদিও এই ঘটনা সবার সামনে আসে না, মিডিয়া অনেক সময় এড়িয়ে যায়, কিংবা হয়তো খবরটি তেমন গুরুত্ব পায় না। কিন্তু যে পরিবারটির উপর আঘাতটা আসে, তাদের কাছে এটা কোনো দৈর্ঘ্যহীন মুহূর্ত নয়, এটা তাদের জীবনের এক কালো অধ্যায়। এমনকি অনেক সময় তারা একে জীবন-মরণের প্রশ্ন হিসেবে দেখে। তাদের কাছে উৎসব মানেই যেন ‘কার্ফিউ’ লেগে যাওয়ার মতো এক পরিস্থিতি।

আমার পরিচিত একজন হিন্দু বন্ধু আছে, নাম তার রোহিত। রোহিতের বাসা বরিশালে হলেও সে ঢাকায় থাকে, পড়াশুনার জন্য। একবার পূজার সময় সে বাড়ি গিয়েছিল। আমি তার সাথে ফোনে কথা বলে জানলাম, তারা পূজা উপলক্ষে বাড়িতে একদমই আনন্দ করতে পারে না। বরং, চারদিকে আতঙ্কে থাকতে হয়। তাদের গ্রামে পূজার সময় অনেক বার অশান্তি হয়েছে। পাড়ায় কিছু যুবক এসেছে, যারা মদ্যপ অবস্থায় এসে তাদের দেবী মূর্তিগুলো ভাঙচুর করেছে। এমনকি তার বাবার উপরও হামলা চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা শুধু তার পরিবারেই নয়, বরং অনেক গ্রামেরই একই অবস্থা।

এইসব ঘটনার পেছনের কারণগুলো আমরা যখন খুঁজতে যাই, তখন দেখি যে এগুলোর মূল কারণ হলো অসহিষ্ণুতা এবং ধর্মীয় অসচেতনতা। আমাদের দেশে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ বাস করে, কিন্তু আমরা তাদের প্রতি সহনশীল হতে পারিনি। সমাজের কিছু অসাধু ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে অথবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে এ ধরনের উস্কানি দেয়, যা শেষ পর্যন্ত নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার হিসেবে নেমে আসে।

আরেকটি বাস্তব ঘটনা শেয়ার করতে চাই, যা আমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। কয়েক বছর আগে ঈদের দিন ছিল, সবাই ঈদের আনন্দে মেতে ছিল। কিন্তু পাশের গ্রামে আমার পরিচিত এক সংখ্যালঘু পরিবারের উপর হামলা হলো। তাদের জমিজমা দখল করার উদ্দেশ্যে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি কিছু গুণ্ডা পাঠায়। সেই পরিবারটি কোনো প্রতিরোধ করার শক্তি পায়নি, কারণ প্রশাসনের কাছ থেকে সঠিক প্রতিকার পায়নি। এমনকি থানায় অভিযোগ করেও কোনো কাজ হয়নি, বরং তারা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই ধরনের ঘটনা আমাদেরকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে আমরা কি এই দেশটাকে সত্যিই ভালোবাসি? আমরা যদি আমাদের দেশের প্রতিটি নাগরিককে সম্মান দিতে না পারি, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে আমাদের উন্নয়ন কোথায়? আমরা উন্নয়নের কথা বলি, কিন্তু সেই উন্নয়ন কি শুধুই অর্থনৈতিক? নাকি এখানে মানবিকতারও জায়গা আছে?

আমাদের উচিত নিজেদের সংখ্যালঘু ভাইবোনদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের কষ্টগুলো শোনা। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা, তাদের কেমন লাগে যখন তারা তাদের নিজেদের প্রাথমিক অধিকারগুলো থেকেও বঞ্চিত হয়। আমরা যদি তাদের কণ্ঠস্বর হতে না পারি, তাহলে কারা হবে? আজকের সমাজে এটা আমাদের দায়বদ্ধতা যে আমরা একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হব, একে অপরের উৎসবে অংশ নেব, একে অপরের কষ্টে পাশে থাকব। যে যার ধর্ম পালন করবে, কিন্তু আমরা সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে যাব।

এই লেখাটা লিখতে গিয়ে ব্যতিক্রম কিছু মানুষের কথা মনে পড়ে যায়, যারা আসলে এই সংকটের সময়ে সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ায়। তারা এদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা করে, সামাজিক মাধ্যমে তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে। এরা আসলে আমাদের সমাজের সেই আলোকবর্তিকা, যারা অন্যদের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে।

অবশেষে, আমার মনে হয় আমাদের সমাজে সংখ্যালঘু মানেই দুর্বল নয়, বরং তারা আমাদের সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা কখনোই একা নয়, আমাদের সবার দায়িত্ব তাদের পাশে থাকা। আমরা যদি সত্যিই ভালবেসে দেশটাকে এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের মধ্যে ধর্মান্ধতা দূর করতে হবে। আমরা যদি নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ না করি, তাহলে একদিন হয়তো আমাদের দেশ হবে এমন এক স্বপ্নের দেশ, যেখানে সবাই সমান অধিকার নিয়ে বাস করবে। আর তখনই হয়তো সত্যিকার অর্থে উৎসব হবে সবার জন্য আনন্দের, কোনো কার্ফিউয়ের ছায়া আর থাকবে না।

By amitav