একটা অবাক করা অভ্যাস আমাদের সমাজে বেশ ভালোই গেড়ে বসেছে। আর তা হলো মূর্তি ভাঙা, আর এই ভাঙচুরের মামলা জমা হয় অজ্ঞাত নামা আসামিদের নামে। নভেম্বর ২০২৩ এর এই পুরনো চিত্র কেমন যেন আমাদের বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক সহনশীলতার প্রতিফলন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্যিই, মূর্তি ভাঙার ঘটনার পেছনে কী ধরনের মানসিকতা কাজ করে, তা আমাদের বোঝা বেশ জরুরি।
এমন একটা সময় ছিল যখন মূর্তি ভাঙার ঘটনাগুলো আমাদের শিশু মনে ভয়ের সৃষ্টি করত। স্কুলে পড়ার সময় শুনতাম কোথাও কোথাও মূর্তি ভাঙা হয়েছে, আর কেমন একটা অস্থিরতা ভর করত আমাদের মধ্যে। কিন্তু সময়ের স্রোতে এগুলো যেন এক ধরনের স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন এই স্বাভাবিকতা? প্রথমত, সমাজের বিভিন্ন স্তরে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক বিভাজন ক্রমবর্ধমান। এই ধর্মীয় সংঘাতের ক্ষুদ্রায়ণ একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ, আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এই ধরনের সহিংসতার দ্বিমত রাখে।
অজ্ঞাত নামা আসামির বিষয়টি নিয়েও অনেক প্রশ্ন উঠছে। যখন কোনো মূর্তি ভাঙার ঘটনা ঘটে, তখন পত্রিকায় দেখা যায়: “অজ্ঞাত আসামির নামে মামলা দায়ের”। সত্যিকথা বলতে কি, এই অজ্ঞাত নামা শব্দটি অনেক সময় আমাদের মনেই এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করে। সত্যিই কি আমরা জানি না কারা এই ঘটনাগুলোর পেছনে রয়েছে? নাকি সমাজের কিছুমাত্রা এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে কেউই দায়িত্ব নিতে চায় না? পুলিশের মামলা দায়েরের ভেতরের নীতিগত জটিলতা এবং সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হয়তো এই অবস্থার পেছনে রয়েছে। তবে এই অজ্ঞাত নামা মামলা কেবলমাত্র বিচারের দৌড়ে পিছিয়ে যাওয়া নয়, বরং এর ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের বিচার পাওয়ার আশা নষ্ট হয়।
মূর্তি ভাঙার ঘটনাগুলো কেবলমাত্র ধর্মীয় উন্মাদনার প্রতিফলন নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক ভারসাম্য যখন বিঘ্নিত হয়, তখন সেই দোলনায় মূর্তি ভাঙাটা হয়ে ওঠে নিষ্ঠুর হাতিয়ার। যদি আমরা একটু গভীরে যাই, দেখব যে ক্ষমতার লড়াইয়ে যারা এগিয়ে থাকে, তারা নিজেরা সরাসরি অতীতের চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করে। এই চেষ্টার একটি অংশ হলো প্রতীকী ইমেজ ধ্বংস করা, যার মধ্যে মূর্তি ভাঙা অন্যতম। এই প্রক্রিয়াটিকে সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিশোধ বলা যায়।
কিন্তু এমন রকমের ঘটনার শুধু ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কারণ থাকলেই তো হয় না, এর পেছনে আছে সামাজিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অসাম্য। আমাদের সমাজে যারা প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ, তাদের অবস্থা অনেক সময়ই অবহেলিত থেকে যায়। আর তাদের এই অবহেলার ফলস্বরূপ, মূর্তি ভাঙার মতো কর্মকাণ্ডে তারা জড়িয়ে পড়ে, যা তাদের চোখে প্রতিশোধের একটি উপায়। তারা ভাবে, যখন তারা কিছু হারানোর নেই, তখন সমাজের এমন কিছু ধ্বংস করতেও কোনো সমস্যা নেই যা অন্যদের কাছে মূল্যবান।
মূর্তি ভাঙার এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। বিচারের ক্ষেত্রে অজ্ঞাত আসামি শব্দটি যখন ব্যবহার করা হয়, তখন সেখান থেকে অনেক প্রশ্ন উঠে আসে। এখানেই প্রশাসনের ভূমিকা থাকা উচিত আরও স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুণগত মান ও প্রক্রিয়া অবশ্যই উন্নত করতে হবে যাতে করে সঠিক ভাবে তদন্ত করা যায় এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করা যায়। এর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা এবং শিক্ষার মাধ্যমে এই ধরণের ঘটনার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলাও জরুরি।
মূর্তি ভাঙা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয়েরও প্রতীক। এই অবক্ষয়কে প্রতিহত করতে হলে আমাদের প্রত্যেককেই দায়িত্ব নিতে হবে। ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখাতে হবে এবং একই সঙ্গে অন্যের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতিও সম্মানবোধ রাখা চাই। আর প্রশাসনিক দিক থেকে অজ্ঞাত নামা মামলা নয়, বরং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের বিচারের আওতায় আনা উচিত। একমাত্র এভাবেই আমরা এই পুরনো চিত্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারব এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গড়তে সক্ষম হব।
এই প্রসঙ্গটি এখানে শেষ হচ্ছে না। একটি প্রশ্ন থেকে যায় – আমরা কি সত্যিই আমাদের সমাজের এই সংকটের সমাধান করতে পারব, না কি এটি একটি নিরন্তর দুষ্টচক্র হয়ে থাকবে? আমাদের প্রত্যেকেরই সেই উত্তর খুঁজতে হবে, এবং আমাদের কর্মের মাধ্যমেই সেই উত্তর খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তাই যদি আমরা সত্যিই চাই এই সমস্যার সমাধান, তাহলে আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিশ্রুতি ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে।
