বাংলাদেশে আমাদের প্রতিদিনের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো থানায় যাওয়া। আপনি জানেন, যখনই কোনো বিপদে পড়ি, বা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হই, স্বাভাবিকভাবে প্রথম চিন্তা আসে থানার। মনে হয়, ওখানে গিয়ে বিচার পাব। কিন্তু বাস্তবতা মাঝে মাঝে কি উল্টো না? থানায় গিয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হওয়ার কথা শুনেছি অনেকে, আর এই নিয়ে আজকের আড্ডা। চায়ের কাপ হাতে বসে একটু আলোচনা করি এই নিরাপত্তা চেয়ে থানায় গিয়ে উল্টো হয়রানির কিছু আলোচিত কেস স্টাডি নিয়ে।

যদি বলি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে থানায় যাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে একধরনের মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। থানাকে কেন্দ্র করে অনেকের মনে একদিকে নিরাপত্তার আশ্বাস থাকলেও অন্যদিকে ভীতি আর শঙ্কার কথাও কম নয়। বিশেষ করে যারা থানায় গিয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের শোনায় ভিন্ন গল্প।

একটা ঘটনা মনে পড়ছে, জাকির নামে এক যুবক। ঢাকার এক জনপ্রিয় এলাকায় তার ছোট্ট একটা দোকান। একদিন তার দোকানে চুরি হয়। স্বাভাবিকভাবেই সে থানায় অভিযোগ জানাতে যায়। কিন্তু পুলিশ রিপোর্ট নেয়ার পরিবর্তে তাকে নানা ধরনের অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে। তার বয়স, কাজের ধরন, এমনকি তার পারিবারিক পটভূমি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। যেন সে চোর নয়, বরং জাকিরই কোনো দোষ করেছে। এটাই কি আমরা আশা করি পুলিশের কাছ থেকে?

এবারের ঘটনা একটু ভিন্ন। ফারজানা নামের এক মেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর সাথে ঘটে যাওয়া এক অভিজ্ঞতা। ফারজানা যখন রাস্তায় ইভটিজিংয়ের শিকার হয়, সে সাহস করে থানায় রিপোর্ট করতে যায়। কিন্তু পুলিশ সেই মেয়েকেই দোষারোপ করতে থাকে, কেন সে রাতে বাইরে ছিল, কেন তার পরনে ঐ পোশাক ছিল। ফারজানার অভিযোগ ওঠে, অথচ তার অভিযোগ শুনতে চাইলো না, বরং তার চারিত্রিক প্রশ্ন তুললো। আপনি বলুন, এভাবে কি সমাজে অপরাধ কমবে?

এই ঘটনাগুলো কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়। আমাদের চারপাশে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, যেখানে ভুক্তভোগীই উল্টো অপরাধী হয়ে যায় থানার চোখে। তবে সব পুলিশই এমন নয়, কিন্তু কিছু সংখ্যক পুলিশের আচরণ আমাদের সবার জন্যই চিন্তার কারণ।

এখন প্রশ্ন আসে, এই পরিস্থিতির জন্য কে দায়ী? আমাদের সমাজ, আমাদের ব্যবস্থাপনা, না আমাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ দূর্বলতা? একদিকে পুলিশবাহিনী যখন কাজের চাপ আর সীমিত সম্পদে জর্জরিত, অন্যদিকে আমাদের সমাজে আইন-শৃঙ্খলার যথাযথ প্রতিপালন না থাকা যেন একটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। যে সমাজে নারী নির্যাতন, চুরি-ডাকাতি, এবং অন্যান্য অপরাধের মাত্রা বাড়ছে, সেখানে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা জানি, বাংলাদেশ সরকার পুলিশের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। পুলিশের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু তার সাথে সাথে প্রয়োজন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। পুলিশের সাথে জনগণের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে হবে। পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে দেখতে হবে। তবে কি আমাদের সমাজে এসব হয়রানি কমবে?

একটি শক্তিশালী প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কবে সেই দিন দেখব যখন থানায় গিয়ে মানুষ পূর্ণ নিরাপত্তা ও সহানুভূতি পাবে, উল্টো হয়রানির শিকার হবে না? আমাদের উচিত সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, যাতে সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে হয়রানির শিকার না হয়, বরং তাদের অভিযোগের যথাযথ বিচার পায়। সমাজের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই সম্ভব একটি সত্যিকার সুরক্ষিত সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে সবাই নিজের নিরাপত্তার জন্য থানায় গিয়ে নির্ভয়ে অভিযোগ করতে পারবে।

সত্যি বলতে, প্রতিটি মানুষের উচিত এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে অপরাধী ও ভুক্তভোগীর মধ্যে পার্থক্য ভুলে কোনো হয়রানি হবে না। আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি পেশায়, পরিবারে এবং থানায় এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে অন্যায়ের শিকার মানুষ অভিযোগ করতে ভয় পাবে না, বরং সাহায্য পাবে। যেন আমাদের সমাজ সত্যিকার অর্থে “সুরক্ষিত” হয়। কবে আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারব? যেখানে থানায় গিয়ে উল্টো হয়রানি নয়, বরং ন্যায়বিচার পাবে।