জ্বলে গেল ঘর, হারাল দলিল–জমি: পুনর্বাসনহীন হিন্দু পরিবারগুলো এখন কোথায়?
বন্ধু, গল্পটা হয়তো শুরুর দিকে একটু থমকে যেতে পারে, কিন্তু আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে শেষ পর্যন্ত আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে। এটা আমাদের বাংলাদেশেরই গল্প, একটা বাস্তবতার গল্প যা আমরা দিনের শেষে হয়তো এড়িয়ে চলতে চাই। তবে সেটা তো আমাদের দায়িত্ব নয়? আজ একটু মন দিয়ে শুনুন। হয়তো আপনার ক্ষণিকের মনোযোগও কারোর জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তাহলে শোনালাম, গত বছর, যখন আগুনের দাপটে কয়েকটি হিন্দু পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারায়, অনেকেই হয়ত তেমন কিছু না বুঝেই সেই খবর দেখে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমি যে সেই গল্পের কিছুটা দেখেছি, সেই আগুনের জ্বলন্ত ছাইয়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর চোখের জল দেখেছি, সেটা হয়তো অনেকে জানেন না। তাদের ঘরবাড়ি শুধু আগুনের শিকার হয়নি, বরং তারা হারিয়ে ফেলেছেন তাদের পরিচয়ের এবং তাদের ভূমির আমানত।
আমি যখন প্রথম এই ঘটনা শুনেছিলাম, তখন আমি শুধু হতবাক হয়েছিলাম। কিভাবে এমন কিছু হতে পারে? আগুনের শিখায় ঘরবাড়ি একেবারে ছাই হয়ে গেছে, কিন্তু যারা সেই ঘরবাড়ির মালিক ছিল, তাদের কী হলো? তারা তো একবারে শূন্য হয়ে গেল। দলিল-জমি সবই হারিয়ে গেল। যারা নিজেরা তাদের পরিচয়ও হারিয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলো না?
হ্যাঁ, আমরা জানি যে আগুন লাগার ঘটনা একটা দুর্ঘটনা হতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে হিন্দু পরিবারগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। এটা কি শুধু দুর্ঘটনা ছিল, নাকি এর পেছনে কোনো পরিকল্পনা লুকিয়ে ছিল? এমন প্রশ্ন তুলতে আমাদের ভয় হয়। কিন্তু দিন শেষে, এই প্রশ্নই তো তুলতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কী করতে পারি? একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে, আমাদের কণ্ঠস্বরই তো হতে পারে তাদের পুনর্বাসনের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। একা আমি বা আপনি হয়তো রাষ্ট্রের নীতি প্রণয়নে ভাগীদার হতে পারব না, কিন্তু আমরা যদি একত্রিত হয়ে আমাদের সামাজিক মাধ্যম, ব্লগ, কিংবা যেকোনো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কথা বলি, তাহলে হয়তো আমরা সেই নিঃস্ব পরিবারগুলোর জন্য কিছু করতে পারব।
এভাবে বলতে বলতে আপনার মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে, “আচ্ছা, আমরা এত কিছু জানলাম, কিন্তু এর সমাধানটা কী?” সমাধান তো আসলে সহজ কিছু নয়। প্রথমত, আমাদের সরকারকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। পুনর্বাসন প্রকল্প চালু করতে হবে এবং বাস্তবে তা কার্যকর করতে হবে। শুধু সংবাদ সম্মেলন বা ফটো সেশনে নয়, বরং বাস্তব জীবনে। আর আমাদের মতো জনগণকে সচেতন হতে হবে, যাতে কেউ তাদের জমি আবার দখল করে নিতে না পারে।
নাগরিক সমাজেরও এ বিষয়ে ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উচিত এই পরিবারগুলোর জন্য ফান্ড গঠন করা, তাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করা। আপনি হয়তো ভাবছেন, “আমি একজন সাধারণ মানুষ, আমার পক্ষে এত কিছু করা সম্ভব নয়।” সত্যি বলতে, সবকিছু একা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আপনার ছোট্ট একটা চেষ্টাও যদি কারো দিন বদলাতে পারে, তাহলে সেটা তো কিছু কম নয়।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, যদি আপনার বাড়িটাও হঠাৎ করে এভাবে হারিয়ে যায়, আপনি কী করবেন? আমরা যতক্ষণ না পর্যন্ত এরকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত এর যন্ত্রণা পুরোপুরি উপলব্ধি করা কঠিন। কিন্তু মানবতার স্বার্থে আমাদের সেই চেষ্টা করতেই হবে।
শেষে একটি কথাই বলব, আমরা যদি একত্রিত হয়ে তাদের পাশে দাঁড়াই, তাহলে হয়তো একদিন এই হিন্দু পরিবারগুলো আবার তাদের হারানো স্বপ্নগুলোকে ফিরে পাবে। হয়তো তারা একদিন বলতে পারবে, “হ্যাঁ, আমরা হারিয়েছিলাম, কিন্তু আমরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি।” সেই দিনটির অপেক্ষায় থাকবো আমরা। আর আপনি?
