যে দিনগুলোতে আমরা কেবলমাত্র বাংলাদেশে শান্তি ও সম্প্রতির প্রত্যাশা করতাম, সেই দিনগুলোর উপর যেন কালো ছায়া বিস্তার করেছে এক নতুন ট্রেন্ড। ধর্মীয় সহনশীলতার দেশ বলে পরিচিত বাংলাদেশে বর্তমানে যে ধরনের হামলা দেখা যাচ্ছে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। একটা সময় ছিল যখন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিনগুলোতে পুরো গ্রাম বা শহর একসাথে মেতেছিল উৎসবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদেরকে সেই সোনালী অতীতে ফিরে যেতে বাধ্য করছে এবং ভাবতে বাধ্য করছে কেন আমরা সেই সম্প্রীতি হারিয়ে ফেলছি।
আইএসকন, মন্দির এবং রাস্তার শোভাযাত্রার উপর ধারাবাহিক হামলা কোন নতুন ঘটনা নয়। বস্তুত, এটি একটি পুরানো সমস্যা যা নতুন রূপে ফিরে এসেছে। এই ধরনের হামলা কেবলমাত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের উপর আঘাত হানে না, বরং এটি শুধুমাত্র একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কথা নয়, বরং পুরো সমাজের শান্তি ও সম্মিলনের উপর আঘাত হানে। যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন ঈদ, পূজা, বড়দিন সবই একসাথে উদযাপন করতাম। আমার মনে পড়ে, কিভাবে আমরা ছোটরা একে অপরের বাড়িতে গিয়ে মিষ্টি খেতাম, উপহার বিনিময় করতাম। কিন্তু এখন, সেই নির্ভীক ভালোবাসা এবং উন্মুক্ত উৎসবের পরিবেশ কোথায় হারিয়ে গেছে?
এই হামলাগুলো আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সমাজের একটি অংশ এখনও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেনি। তাদের জন্য ধর্মীয় পার্থক্য যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অবশ্যই একটি বড় বিপদ। এভাবে চলতে থাকলে আমরা হয়তো একদিন সেই দিনগুলোতে ফিরে যাব, যখন মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হত না, তাদের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখত। আমরা কি এমন একটি সমাজে বাস করতে চাই যেখানে ধর্ম শান্তির বদলে সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়?
অনেকেই হয়তো ভাবছে, কেন এই হামলাগুলো বারবার হচ্ছে এবং কেন এগুলো থামছে না। এর পেছনে কেবলমাত্র একটি কারণ নয়, বরং অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। প্রথমত, আমাদের দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামর্থ্য ও সংস্থান সীমাবদ্ধ। তাই তারা সবসময়ই এই ধরনের হামলাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয় না। দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজের কিছু অংশে এখনও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার অভাব রয়েছে। এমনকি অনেক সময় রাজনৈতিক স্বার্থও এতে জড়িত থাকে। যার ফলে এই হামলাগুলো হয়ে ওঠে আরো জটিল।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য কেবলমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে, আমাদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং সম্প্রীতি প্রচার করা উচিত। পরিবারের মধ্যে, স্কুলের পাঠ্যক্রমে, সমাজের নানা অঙ্গনে এর প্রচার ও প্রসারের উদ্যোগ নিতে হবে।
এক্ষেত্রে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা এবং সহনশীলতার বীজ বপন করতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা উচিত যাতে করে আমরা সবাই বুঝতে পারি যে, ধর্মীয় পার্থক্য আমাদের বিভাজনের কারণ নয়, বরং বৈচিত্র্যের উদযাপন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ঘরোয়া শিক্ষায়ও এর প্রচার ও প্রসার করতে হবে।
আমাদের চারপাশে অনেক ভালো উদাহরণ রয়েছে যেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একে অপরের উৎসবে অংশগ্রহণ করছে, একে অপরকে সম্মান করছে। এই উদাহরণগুলোই আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। আমাদের এই উদাহরণগুলোকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসা উচিত, যাতে গোটা দেশ এই বার্তাটি পায় যে সম্প্রীতি ও সহনশীলতা এখনও বিদ্যমান।
এই হামলাগুলো যে শুধু ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর জন্য ক্ষতিকর তা নয়। এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলে। অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামাজিক অস্থিরতা এবং বিশ্বাসের সংকট সৃষ্টি হয়। সুতরাং, এই সমস্যার সমাধান কেবলমাত্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিষয় নয়, বরং পুরো সমাজের বিষয়।
আমার মনে হয় এখন সময় এসেছে আমরা সবাই একসাথে বসে চিন্তা করি, আমরা কীভাবে আমাদের সমাজকে সেই পুরোনো সোনালী দিনে ফিরিয়ে নিতে পারি। আমরা কীভাবে সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতা গড়ে তুলতে পারি। কারণ আমরা যদি আজ তা করতে না পারি, তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কেবল দ্বন্দ্ব এবং সংঘর্ষের সমাজ রেখে যাব। আজকের দিনেই আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে আগামীকাল আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি যে, আমরা আমাদের সমাজকে সম্প্রীতির পথেই পরিচালিত করেছি।
আমাদের সেই দিনগুলো ফিরে পেতে হবে, যখন ধর্মীয় উৎসব মানে ছিল আনন্দ এবং ভালোবাসার মেলা। এখনই সময় সেই পথের সন্ধান করার, আমাদের ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ এবং সুন্দর করার। আমরা কি সেই পথে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত?
