বিচারহীনতার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন রাজনীতি: ২০২৪-এর সহিংসতার মামলাগুলো কোথায় আটকে আছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলতে গেলে বিচারহীনতার প্রসঙ্গটি অনিবার্যভাবে চলে আসে। এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে অপরাধ হয়েছে, ভুক্তভোগী আছে, কিন্তু বিচার নেই। এই অবস্থা যেন সমাজের ওপর এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালেও আমরা এই চিরাচরিত সমস্যার সমাধান করতে পারিনি। বরং, এই বছরটি আমাদেরকে আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে বিচারহীনতা কিভাবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সমাজের গভীরে প্রবেশ করেছে।

এবারের সহিংসতা: ঘটনা ও প্রবণতা

২০২৪ সালের বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা যেন এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংঘর্ষ, ধর্মীয় উদ্দীপনা, এমনকি সামাজিক মিডিয়ার মাধ্যমে উত্তেজনা সৃষ্টি করে সহিংসতা প্ররোচিত করা, এই সমস্ত ঘটনার পেছনে আছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। অবশ্যই, কোনো রাজনৈতিক দলের নাম এখানে উল্লেখ করতে হলে আমরা সবাই একটি পরিচিত ছবির কথাই বলব। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পরিচিত ছবিটিও কোনো একক দলের সংকীর্ণতার ফল নয়; বরং এটি আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

এমনকি কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রথমে একটি স্বচ্ছ তদন্ত শুরু হলেও তা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। যার কারণে, অপরাধীরা ভয়ে নেই, বরং তারা আরও সাহসী হয়ে উঠে। আসলে, আমাদের বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা এটাই। যে কোনো একটি মামলা শুরু হলে তার ফয়সালা হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। যার ফলে অপরাধীরা বিচার এড়িয়ে যেতে পারছে।

বিচারহীনতার রাজনৈতিক প্রভাব

এই বিচারহীনতার প্রভাব যে শুধু অপরাধীদেরই বাহাদুরি দেয় তা নয়, এটি সাধারণ মানুষের ওপরেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। মানুষের মনে সরকারের প্রতি আস্থা কমে যায়। রাজনীতিবিদেরা তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে এই বিচারহীনতার ফায়দা নেয়। তারা জানে যে, জনগণের আস্থা অর্জন না করলেও ক্ষমতায় থাকতে পারবে। এবং এখানেই তারা সফল হয়। তারা বুঝতে পেরেছে যে, একটি দুর্বল বিচার ব্যবস্থা তাদের জন্য সুবিধাজনক।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা এর থেকে মুক্তি কিভাবে পাব? কীভাবে আমরা একটি শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি যেখানে অপরাধী তার অপরাধের শাস্তি পাবেই?

চলমান মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা

২০২৪ সালের সহিংসতা সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে তা জানতে গেলে আমরা ভিন্ন ভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে পারি। তবে বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ মামলাই এখনো ঝুলে আছে। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ ছাড়া বিচার ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে বলে মনে হয়। এছাড়া, রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতা, প্রশাসনের অদক্ষতা এবং অভিযান তদারকির অভাবে এই মামলাগুলোতে তেমন অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তদন্তের ধীরগতি এবং সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবও অন্যতম কারণ হিসেবে রয়ে গেছে।

তবে এই সমস্যার সমাধান হিসেবে কিছু উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। যেমন, ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে মামলার তদারকি করা, বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো কি যথেষ্ট? এই বিপুল সংখ্যক অবিচারের ফাইল যখন খোলা থাকে, তখন আমাদের সচেতন হতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধান খুঁজতে হবে।

বিচারহীনতার সমাজে প্রভাব

বিচারহীনতার সমাজে অপরাধীরা আরও পশ্চাতে চলে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ও অসহায়ত্বের জন্ম নেয়। এমন সমাজে মানুষের পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস কমে আসে। অপরাধীরা যখন দিনেদিনে শক্তিশালী হতে থাকে, তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অসহায় বোধ করে। বিচারহীনতা কেবল আইনকে দুর্বল করে দেয় না, এটি গোটা সমাজকেও দুর্বল করে তোলে।

প্রশ্ন হলো, কিভাবে আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারি? একটি স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং অধীনস্তমুক্ত বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছা কতটা প্রকৃতপ্রস্তাবে বাস্তবায়নযোগ্য?

শেষ কথা

২০২৪ সালের বাংলাদেশে বিচারহীনতার অধিকারী স্থবিরতা রাজনৈতিক সহিংসতার এক অনর্থক চক্রে পরিণত হয়েছে। আমরা কি কখনও এই চক্র থেকে বের হতে পারব? নাকি বিচারহীনতার এই অভিশাপ আমাদের সাথে অনন্তকাল থেকে যাবে? আমাদের সমাজ এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার কিভাবে আমরা করতে পারি, তা নিয়ে এখনই ভাববার সময় এসেছে। কারণ, একটি শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা ছাড়া সামাজিক ন্যায়বিচার কখনোই নিশ্চিত করা যাবে না। আপনার মতামত কি এই ব্যাপারে? আমরা কি করে এই চক্র থেকে বের হতে পারি? আপনার চিন্তাভাবনা জানাতে ভুলবেন না।

By laboni