আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, যখনি বাংলাদেশে কোনো নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসে, পুরো দেশ যেন এক অদ্ভুত শান্তিতে ঢেকে যায়। সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা সবাই যেন হঠাৎ খুব দায়িত্ববান হয়ে ওঠে। কিন্তু নির্বাচন শেষে সেই শান্তির মোড়কেই যেন আড়ালে ঘটে যায় একের পর এক দুর্যোগ, যার প্রধান শিকার হন আমাদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।
এটা যেন আমাদের দেশের নির্বাচনী চক্রের এক অলিখিত সত্য। আমি নিজেও এই নিয়ে অনেকবার ভাবনায় ডুবে গেছি। আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন যদি কিছুটা হলেও মানবিক হতো, তাহলে হয়তো এই সমস্যার সমাধান খোঁজা সম্ভব হতো। কিন্তু আজ যখন এটা লেখার জন্য বসলাম, তখন আমার নিজের অনেক স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠতে শুরু করলো।
আমার ছোটবেলা থেকেই নির্বাচনের সময়টা ছিল এক ধরণের উৎসব। নতুন জামা, মেলা, মাইকিং-এর আওয়াজ সব কিছুই যেন গ্রাম বাংলার মানুষের জন্য এক বাঁধভাঙা আনন্দের উপলক্ষ। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকতো এক বিপদের ছায়া। এখন বুঝতে পারি, তখনকার সেই ছোট চোখে যে আনন্দ দেখতাম, তা আসলে ছিল দুঃখের আগমনী বার্তা।
এই যে বলছি, নির্বাচনের আগে শান্ত, পরে ঝড় তা কিন্তু কোনো প্রবাদ নয়। আমাদের দেশে এটা ঘটছে বারবার, একের পর এক। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, যারা সাধারণত রাজনৈতিক ক্ষমতার পেছনে লুকিয়ে থাকা বিষয়গুলো নিয়ে মাথা ঘামায় না, তারাও এই ঝড়ের মধ্যে আটকা পড়ে যায়। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর তাদের উপর নির্যাতন, হামলা, বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেওয়া এমনকি খুনের মতো ঘটনাও ঘটে। ভাবতেই অবাক লাগে, এই শান্তির আড়ালে কীভাবে এত বড় ঝড় লুকিয়ে থাকে!
আমার পরিচিত এক বন্ধু, রামু অঞ্চলের বাসিন্দা, তার সাথে কথা হচ্ছিল এই বিষয়ে। সে বলছিলো, ছোটবেলা থেকেই তারা এই ঝড়ের শিকার হয়েছে। যখনই নির্বাচন আসে, তখন তাদের মন যেন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় কখন কোন দিক থেকে হামলা হবে, কখন বাড়ি-ঘরের উপর আক্রমণ হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমার বন্ধুর কণ্ঠে যে আতঙ্ক শুনলাম, তা সত্যিই আমাকে ব্যথিত করলো।
এই ঘটনা কিন্তু শুধু রামুর নয়। বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে এই একই চিত্র। বিশেষ করে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের দুঃখভরা কন্ঠস্বর আমাদের কান অব্দি পৌঁছায় না। তারা যেন আমাদের সমাজে এক অনাহুত অতিথি, যাদের নিয়ে ভাবার সময় আমাদের নেই। তাদের নিরাপত্তার কোন প্রশ্নই আসে না, কারণ তাদের নিরাপত্তা তো কখনোই ছিল না।
যা ভাবিয়ে তোলে তা হলো, কেন এই নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না? এর পেছনে কি শুধুই রাজনৈতিক বিদ্বেষ, নাকি অন্য কোনো কারণও আছে? আমি ভাবি, মূলত এই নির্যাতন কিন্তু রাজনৈতিক শক্তির অদ্ভুত এক খেলা। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বির উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করা হয়। সহজ টার্গেট হিসেবে তারা এই নির্যাতনের শিকার হন।
বিভিন্ন সময়ে এই বিষয়ে বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু সমস্যার সমাধান আজও অধরা। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবাই যেন কেমন নীরব দর্শক হয়ে থাকে। তাদের নীরবতা যেন এই নির্যাতনকে আরো উৎসাহিত করে। আমরা যারা সাধারণ জনগণ, আমাদেরও দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় মানুষের প্রতি নিরপেক্ষ থাকে না। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের সংবিধান যদিও সবার জন্য সমানাধিকার নিশ্চিত করেছে, কিন্তু বাস্তবে তার কতটুকু প্রতিফলন পাচ্ছে? সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কোন উদ্যোগ নেই বললেই চলে। এমনকি অনেক সময় তাদের নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবিতেও তারা ভীত থাকে। এটা কি তবে আমাদের উন্নত সমাজের প্রতিফলন?
নির্বাচনের আগে যে শান্তির বাতাস বইতে থাকে, তা যদি সত্যিই সবার জন্য শান্তি নিয়ে আসতো, তাহলে হয়তো আমাদের দেশের সংখ্যালঘুরা আজ এই নির্যাতনের শিকার হতো না। কিন্তু এই সবই কেবলই মেকি শান্তি। আসল শান্তি তো তখনই আসবে, যখন আমরা সবাই মিলে তাদের পাশে দাঁড়াবো, তাদের অধিকার রক্ষা করবো।
এই নির্যাতন বন্ধে আমাদের কি ভূমিকা থাকা উচিত? আমরা কি পারি না এই নির্যাতনের চক্র থেকে মুক্তি পেতে? সমাজের সকল স্তরের মানুষের চেষ্টায় যদি সত্যিই এই পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে হয়তো একদিন আমাদের দেশ সত্যিকারের শান্তির দেশ হয়ে উঠবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত? আমাদের কি সেই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে যা আমাদের এই জগতের সকল মানুষের জন্য সমানাধিকার নিশ্চিত করতে অনুপ্রাণিত করবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই। যত দ্রুত আমরা এই দায়িত্ব বুঝব, তত দ্রুতই হয়তো এই নির্যাতনের চক্র থেকে মুক্তি পাবো।
