ঢাকার একটি উঠোনে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে যে কথাটি আজকাল সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তা হলো ‘দেশের অবস্থা ঠিক নেই’। আপনি আমি, আমরা সকলেই যেন এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছি। বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক হামলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ভাবতেই অবাক লাগে, যেখানে আমরা ধর্মের দোহাই দিয়ে মানবতা, সমতা আর শান্তির কথা বলি, সেখানে কীভাবে এই হামলার সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে! আজকের এই লেখার মাধ্যমে আমাদের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার এক আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরবো।
২০২৫ সালের আগস্ট মাস, বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানলাম যে গত বছরের তুলনায় দেশে সাম্প্রদায়িক হামলার সংখ্যা বেড়ে ৩১০০-তে পৌঁছেছে। অথচ আগের বছর, ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি ছিলো ২২৪৪। এই সংখ্যাগুলো হয়তো শুধুমাত্র কোডের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু এর পিছনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের তাজা রক্ত, ভাঙা ঘরবাড়ি, আর নিরপরাধ মানুষের কান্না।
একটি সমাজের প্রকৃত রূপ বোঝা যায় তার দুর্যোগময় মুহূর্তে। দুর্যোগ মানেই যে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অশান্তি এবং ভাঙনের বিপদও। সাম্প্রদায়িক হামলার এই সংখ্যা বাড়ার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে? আমাদের সবার মনে এই প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে। কি এমন হলো যে আমরা এতটা অসহিষ্ণু হয়ে গেলাম?
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ইতিহাস অনেক পুরনো। তবে গত কয়েক বছরে এটির সংখ্যা এমনভাবে বেড়েছে যা আমাদের সচেতন নাগরিকদের জন্য খুবই চিন্তার বিষয়। সামাজিক মিডিয়া আর সংবাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আমরা প্রায়ই এমন খবর পড়ি বা দেখি, যেখানে ধর্মীয় অনুভূতি আঘাত করার অভিযোগে কোন নিরীহ জনপদে হামলা করা হয়েছে। এই হামলাগুলোর পেছনে কারা থাকে, তাদের উদ্দেশ্যই বা কি, এটাও অনেকটা অজানা।
অনেকের মতে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই এই ধরণের হামলা সংঘটিত হয়। কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থের জন্য পুরো সমাজকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। আর আমরা সাধারণ মানুষ, যারা শান্তিতে বাস করতে চাই, তারা সেই ঝুঁকি মোকাবেলা করতে বাধ্য হই। কখনো কখনো ধর্মীয় উস্কানিতে এই হামলা ঘটানো হয় যা আসলে কোনো ধর্মের শিখানো পথ নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক মিডিয়ার ব্যাপক প্রচলনও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সামান্য একটা গুজব ছড়িয়ে পড়া মানেই কিছু মূহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার লাইক, শেয়ার। আর তার ফলস্বরূপ ঘটে যায় অঘটন। এই ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর অপব্যবহার রোধে আমরা কি করছি? কিভাবে আমরা এই বিভ্রান্তি রোধ করতে পারি?
এটি সত্য যে বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশে এই ধরনের ঘটনাগুলো সমাজের অনেক সমস্যা তুলে ধরে। কিন্তু বিচারহীনতা, সঠিক তদন্তের অভাব, এবং প্রায়শই অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি না পাওয়া আদালতের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, এই ধরনের হামলার তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হলেও পরে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
স্কুলে পড়ার সময় একটা কথা শুনেছিলাম,সহিষ্ণুতা আমাদের সংস্কৃতির একটি বড় অংশ। তবে কই গেল আমাদের সেই সহিষ্ণুতা? আমরা কি তাহলে ভুল পথে হাঁটছি না কি আমাদের তৈরি করা পথরেখাই ভুল?
এই সমস্যার সমাধানে আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের উচিত ভ্রাতৃত্ব, সহিষ্ণুতা এবং শান্তির বার্তা দেওয়া। রাজনৈতিক নেতাদের উচিত নিজেদের স্বার্থের আগে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া। আর আমাদের, সাধারণ নাগরিকদের উচিত সবসময় দ্বিধায় না থেকে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো।
আমাদের সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ, সুন্দর এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশে বেড়ে উঠতে দিতে হবে। সেই লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধে আমাদের সকলের প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি। হয়তো এভাবেই আমরা ৩১০০ নয়, বরং শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে পারব এই ন্যাক্কারজনক হামলাগুলো।
তবু, প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সত্যিই এতোটা অসহিষ্ণু হয়ে গেছি যে সামান্য উস্কানিতেই আমাদের মধ্যে বাস করা হিংস্রতা বেরিয়ে আসে? এটাই কি আমাদের প্রকৃত রূপ? নাকি আমরা পরিবর্তনের পথে হাঁটতে প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে, কিন্তু যাত্রাটা শুরু করতেই হবে, আজ এবং এখনই।
