শিরোনামটা যেন একটা ঝড়ের মতো এসে পড়লো। ‘স্বাধীনতা–পরবর্তী সবচেয়ে ভয়াবহ সময়’: সংখ্যালঘু নেতাদের বিবৃতি। একটা মুহূর্তে ভেবেছিলাম যেন সময়টা ১৯৭১ সালের দিকে ফিরে গেছে, কিন্তু না। এটা ২০২৫ সালের আগস্ট মাসের কথা। কী এমন ঘটেছে যা এই ধরনের বিবৃতি দিতে বাধ্য করেছে সংখ্যালঘু নেতারা? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা কি এমন কিছু ভুল করছি যা আমাদের এতদিনের অর্জনকে ধূলিসাৎ করতে পারে?
আমার বন্ধু মিজানুলের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা শুরু করলাম। সে বলল, তুমি কি জানো, আমাদের সমাজে সংখ্যালঘুরা কতটা অসহায়? তারা সব সময় ভয় নিয়ে বাঁচে। তার কথায় আমার মনে হলো, হ্যাঁ, হয়তো আমাদের স্বাধীনতার পর এত বছর পার হলেও কিছু জায়গায় আমরা এখনও পিছিয়ে আছি। আর সেই পিছিয়ে থাকার মূল্য চোকাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষদের। কিন্তু কেন? কেন আমরা এত বছরে কিছু পরিবর্তন করতে পারলাম না?
তাহলে এমন কী ঘটেছিল যে নেতারা এতটা চরম বিবৃতি দিতে বাধ্য হলেন? প্রতিবছরের মত এই বছরও নানা ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। ধর্মীয় কারণে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হামলা, মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা যেন একটা দৈনন্দিন চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কেন এই বিদ্বেষ? আমাদের কি এতটাই অন্ধত্ব ঘিরে ধরেছে যে আমরা আমাদের নিজস্ব মানুষদেরই গ্রহণ করতে পারছি না?
যে দেশটা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করলো, যে দেশে সব ধর্মের মানুষ একত্রে যুদ্ধ করেছে, সেই দেশেই কেন আজ এই হাল? আমার মনে পড়ে গেল গ্রামের সেই ছোট্ট ঘরটা যেখানে আমরা সবাই মিলে সন্ধ্যায় বসে গল্প করতাম। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সে গল্পগুলো আজ যেন দুর্লভ হয়ে গেছে।
মিসেস করিমের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, যিনি তার সবুজ শাড়িটা পরে আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমি তার পায়ের কাছে বসে গল্প শুনতাম। তার মুখে শুনতাম সেই সময়ের কথা যখন মুসলিম ও হিন্দুর মধ্যে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। আজকের দিনে সেই কথাগুলো গল্পই থেকে গেছে, বাস্তবায়িত হতে পারেনি।
আমার মনে হয় আমাদের সমাজের কিছু মৌলিক পরিবর্তন দরকার। শিক্ষার মাধ্যমে, সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। যদি আমরা সত্যিই চাই আমাদের সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে, তাহলে আমাদের অবশ্যই একসাথে কাজ করতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেখানে ধর্ম বা জাতি কোনো বিষয় নয়, শুধু মানুষত্বই বড়। আমাদের নতুন প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা মানবিক হয়, ধর্মীয় বিদ্বেষমুক্ত হয়।
আরেকটা বিষয় যা আমার মনে হয় খুব গুরুত্বপূর্ণ তা হল মিডিয়ার ভূমিকা। কোনো ঘটনা ঘটলে আমাদের মিডিয়াগুলো তা এমনভাবে প্রচার করে যে সেটা বৈরিতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমন কিছু ঘটনা থাকে যা অনেক বড় আকারে উপস্থাপন করে আমাদের মিডিয়া। তারা যদি একটু বেশি সচেতন হয় এবং সঠিকভাবে খবর প্রচার করে, তাহলে হয়তো এই ধরনের সমস্যা কিছুটা এড়ানো সম্ভব।
আমার ব্যক্তিগত মতামত হল, কোনো দেশ বা সমাজের উন্নতি তখনই সম্ভব যখন সে নিজের দোষ-ত্রুটি স্বীকার করে এবং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে পরিবর্তন করতে চায়। আমাদের সমাজের সংখ্যালঘুদের এই আবহাওয়ায় নিরাপত্তা দিতে হবে, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি সত্যিই সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পেরেছি যার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা লড়াই করেছেন?
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমি বলতে চাই, আমরা সবাই একসাথে কাজ করলে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে, আমাদের নতুন প্রজন্মকে এই ধরনের বিদ্বেষমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার পথে চিন্তা করতে হবে। যদি আমরা সবাই একসাথে কাজ করি, তাহলে হয়তো এই পরিস্থিতি পাল্টানো সম্ভব। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি আমাদের অংশটুকু পালন করতে প্রস্তুত? আমরা কি সত্যিই সেই পরিবর্তন চাই? এই প্রশ্নটাই আমাদেরকে দিনের শেষে নিজেকে করতে হবে, এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে।
