অনেকেই নীরবে চলেযাচ্ছে: ভারতে গিয়ে ‘অবৈধ অভিবাসী’ তকমা জুটছে বাংলাদেশি হিন্দুদের কপালে

কিছু কিছু বিষয় আমাদের চোখের সামনেই ঘটে চলে, কিন্তু আমরা তা নিয়ে ভাবার সময় পাই না কিংবা ভাবতে চাই না। অথচ সেই ঘটনাগুলোই অনেক মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। আজকে আপনাদের সাথে এমনই একটি ঘটনা শেয়ার করতে যাচ্ছি, যা হয়তো আমরা অনেকেই দেখেও না দেখার ভান করি। বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই আজ নীরবে ভারতে পাড়ি জমাচ্ছেন, আর সেখানে গিয়ে ‘অবৈধ অভিবাসী’ তকমা জুটছে তাদের কপালে। কেন এমন হচ্ছে? এর পিছনে কী কারণ লুকিয়ে আছে?

আমি যখন স্কুলে পড়তাম, তখন আমাদের পাশের বাড়ির দাশ পরিবার হঠাৎ করেই সবার অগোচরে চলে গেল। পরে শুনেছি, তারা ভারত চলে গেছেন। কিন্তু কেন? তাদের নিয়ে খুব একটা আলোচনা করা হয়নি, শুধু এটুকু জানা গেল যে, ভারতে তাদের আত্মীয়দের কাছে থাকতে গেছেন। এখন ভাবলে মনে হয়, তারা হয়তো একান্তই বাধ্য হয়েছিল সেই সিদ্ধান্ত নিতে। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা আছে; যেখানে নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক বৈষম্য এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করছে।

আমাদের দেশের সমাজে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হয়, তবে তাদের প্রকৃত সমস্যাগুলো নিয়ে খুব কমই বলা বা করা হয়। অনেকেই হয়তো মনে করে, বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর চেপে বসা এই চাপগুলো শুধুই একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সমস্যা। কিন্তু আমি বলব, এটা পুরো সমাজের সমস্যা। কখনো কখনো তারা জমিজমা হারান, কখনো আবার পরিবার-পরিজন নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। আর এই চাপ শুধু তাদের নয়, এটা আমাদেরও। কেননা, তাদের নিরাপত্তাহীনতা আমাদের সমাজের ব্যর্থতাকে প্রকাশ করে।

ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে মাঝে মাঝেই খবর আসে যে, বাংলাদেশি হিন্দুদের একটা বড় অংশ ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু তারা সেখানে গিয়ে কীভাবে থাকছেন, কীভাবে জীবন কাটাচ্ছেন, তা নিয়ে আমরা কতটুকু জানি? বাস্তবতা হলো, তারা যেন দুই দেশের মধ্যেই পড়ে গেছেন। বাংলাদেশে তারা সংখ্যালঘু, আর ভারতে তারা ‘অবৈধ অভিবাসী’। দুই জায়গাতেই তারা যেন অযাচিত। ভারতের নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, যা এত আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা কিছুটা হলেও তাদের আশার আলো দেখায়। কিন্তু সব কিছুরই একটা সীমা আছে। সব বাংলাদেশি হিন্দুর জন্য এই আইন প্রযোজ্য নয়, আর যারা প্রযোজ্য তাদেরও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। দিন শেষে, এই প্রক্রিয়া কতজনের জন্য সফল হয় সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

এই যে দুই দেশের মধ্যে পড়ে থাকা, এই যে পরিচয় সংকট এটা কোনোভাবেই তাদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটা আমাদের সম্পূর্ণ সিস্টেমের ব্যর্থতা। আমি কল্পনাও করতে পারি না, কেমন অনুভূতি হতে পারে যখন কেউ পরিচয় সংকটে ভোগে। সেই সাথে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি দেওয়ার বেদনা যেন আরেক ধাপ বাড়িয়ে দেয় তাদের কষ্ট। আমরা যারা বাংলাদেশের নাগরিক, আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করা, সরকারি পদক্ষেপের জন্য চাপ সৃষ্টি করা।

আবার, আমি নিজেও যখন ভারতে গিয়েছিলাম ঘুরতে, তখন দেখেছিলাম কিছু বাংলাদেশি হিন্দু পরিবারকে, যারা আমাদের মতোই আমোদ-প্রমোদে মেতে রয়েছেন। তবে তাদের চোখে লুকানো এক ধরনের উদ্বেগ ছিল, যা আমি অনুভব করতে পারি। অনেকেই হয়তো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য চলে গেছেন সেখানে, কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ সেখানে কতটা নিরাপদ তা নিয়েও তারা সংশয়ে ভোগেন। সেই সাথে পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, যেখানেই থাকেন না কেন, নিজেকে সবসময় কোন এক নির্দিষ্ট পরিচয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করতে হয় তাদের।

আমাদের দেশের সরকারও এই সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করার কথা বলে থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের পদক্ষেপ কতটা কার্যকরী হচ্ছে? হয়তো কিছুদিন পর পরই কিছু ইভেন্ট হয়, কোথাও না কোথাও আলোচনা হয়, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এসবের ফলাফল কতটা কার্যকর তা নিয়ে আমরা ভাবি না। আমার বিশ্বাস, এই সমস্যা সমাধান করতে হলে আমাদের সবারই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু সরকার নয়, সমাজের প্রতিটা স্তরে এ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

একটা সমাজের প্রগতিকে মাপা যায় সেই সমাজ কতটা বিনিয়োগ করে তার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং সমানাধিকারের জন্য। আমাদের দেশেও এ নিয়ে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, কিন্তু তা কতটা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে সেটা দেখা একান্তই জরুরি। এছাড়া, যারা ইতিমধ্যেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, তাদেরও ফিরে আসার সুযোগ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য।

তাহলে কি আমরা এভাবে নীরবেই চলতে থাকব, নাকি কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগী হব? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দায়িত্ব কিন্তু আমাদের সবারই হাতেই। সমাজ হিসেবে আমরা যদি একত্রিত হই, যদি প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যকরী সমাধান বের করতে পারি, তাহলে হয়তো আমরা ভবিষ্যতে আরও অনেক দাশ পরিবারকে তাদের নিজভূমিতে ফিরিয়ে আনতে পারব। এটা কি সম্ভব নয়? হ্যাঁ, সম্ভব। শুধু চাই আমাদের একসঙ্গে কাজ করার দৃঢ় ইচ্ছা এবং পদক্ষেপ।

By arjun