দুর্গা পূজায় ৯৫টি মন্দির–স্থাপনায় হামলার রেকর্ড: উৎসবের নামই এখন আতঙ্ক

কল্পনা করুন এক সন্ধ্যা, যখন পুরো শহর আলোকিত হয়ে উঠেছে। শিশুরা নতুন পোশাকে সেজেছে। চারপাশে ঢাকের তাল, শঙ্খের ধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে। এমন একটি সময়, যখন প্রতিটি হিন্দু পরিবার তাদের ঘরে ঘরে মায়ের আগমনী সঙ্গীত বাজাচ্ছে। হ্যাঁ, আমি দুর্গা পূজার কথাই বলছি। আমার মতো যারা এই উৎসবের সাথে বেড়ে উঠেছেন, তাদের জন্য এটি এক বিশেষ সময়। তবে আজকের আলোচানায় সেই উৎসবের রঙে কিছুটা কালো ছায়া ঢেকে গেছে।

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে, এক অপ্রত্যাশিত অ্যাটাকের ঘটনা ঘটেছে। ৯৫টি মন্দির এবং প্রতিমা ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। ভাবতে পারেন? উৎসব, যা একসময় আনন্দের আর মিলনের প্রতীক ছিল, তা এখন আতঙ্কের নামান্তর হয়ে উঠেছে। কেন এমন হলো? এর পেছনে দায়ী কে বা কারা? কোনো বিশেষ গোষ্ঠী, রাজনৈতিক মতলব, নাকি নিছক অসহিষ্ণুতা?

সমাজে যখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পায়, তখন তার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে বাধ্য। দুর্গা পূজা হলো ধর্মীয় উৎসব, যেখানে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ একসাথে মিলেমিশে আনন্দ করে। কিন্তু যখন এমন নৃশংস হামলা ঘটে, তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক, ভয় এবং উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। যেমনটি এই বছর আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। মন্দিরে হামলার ঘটনা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়কে নয়, বরং পুরো দেশের শান্তি এবং সম্প্রীতিকে ব্যাহত করেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব ঘটনার পেছনে কারা? সকলে কি তবে কেবল মৌলিক উন্মাদনা, না কি এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ? আমরা যখন এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করি, তখন মনে হয় যে, এটি আসলে এক ধরনের ঘৃণা এবং সহিংসতার প্রকাশ। কিছু লোক ধর্মের আড়ালে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধ করতে চায়। তারা তাদের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত মতলব হাসিল করতে চাইছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের শিক্ষার অভাব এবং সামাজিক অসচেতনতা এসব ঘটনার পেছনে বড়ো ভূমিকা পালন করছে। যখন একটি সমাজে মানুষ শিক্ষিত হয় না, তখন তারা সহজেই ভুল ধারণার শিকার হয়। ধর্মের প্রকৃত মর্মার্থ না বুঝে, তারা কেবল মাত্র যা শুনছে তার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। এইসব ভুল ধারণা থেকে ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণা, যা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় সহিংসতায়।

এই সমস্যার সমাধানে আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং সম্প্রীতি বৃদ্ধি করতে হবে। স্কুল এবং কলেজগুলোতে এই বিষয়ে আলাদা শিক্ষা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপরও নজরদারি বাড়াতে হবে। কারণ এই মাধ্যম অনেক সময় ভুল তথ্য প্রচারের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।

আমরা কি পারি না একটি শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে? যেখানে প্রতিটি ধর্মের মানুষ তাদের উৎসব পালন করতে পারবে নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে? আমাদের উচিত সামাজিক এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য কাজ করা। শুধুমাত্র সরকার এবং প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, আমাদের প্রতিটা মানুষের উচিত এই বিষয়ে সচেতন হওয়া।

একটি কথা বলা হয়, “ভালো কাজের শুরুটা নিজের থেকেই করতে হয়”। তাই আসুন আমরা আমাদের চারপাশের মানুষকে সম্প্রীতির শিক্ষা দিই। আমাদের ছোট ছোট প্রচেষ্টা হয়তো একদিন বড়ো পরিসরে ফলপ্রসূ হবে।

অবশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ধর্ম কোনোদিনই সহিংসতার শিক্ষা দেয় না। প্রতিটি ধর্মই শান্তি, সহিষ্ণুতা এবং মানবতার কথা বলে। তাহলে কেন আমরা সেই শিক্ষাকে কাজে লাগাচ্ছি না? ২০২৫ সালের এই দুর্গা পূজার ঘটনা আমাদের এক বড়ো শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। আমরা কি এই শিক্ষা থেকে শিখতে পারব, নাকি আবারও একই ভুলে পা রাখব? সময়ই তা বলে দেবে। তবে, আমাদের আজকের কাজই আগামীকালের পথ প্রদর্শক হবে।

আসুন, সকলে মিলে একসাথে কাজ করি, যাতে আগামী বছরের দুর্গা পূজা শুধুই আনন্দের উৎসব হয়ে ওঠে, আতঙ্কের নয়। আমাদের দেশকে আমরা কেমনভাবে দেখব, সেটি আমরা এখনই ঠিক করতে পারি। সম্প্রীতি এবং ভালোবাসার এক নতুন অধ্যায় শুরু করা যাক।

By laboni