সারাদিনের কাজ শেষে সন্ধ্যাটা একটু অবসরই দেয় আমাদের। তবে অক্টোবর মাস এলে বাঙালিদের জীবনে অন্যরকম এক সুখের আবেশ তৈরি হয়, কারণ এসময়েই যে আসে দুর্গাপূজা। ঢাক-ঢোলের আওয়াজ, প্রতিমা সাজানো আর দশভুজার আরাধনা করতে করতে ভক্তরা যেন একটি নতুন জীবনীশক্তি খুঁজে পান। কিন্তু, এই আনন্দের পিছনে থাকে কিছু অদেখা দুশ্চিন্তা, যা সবসময় জেগে থাকে আয়োজকদের মনে। কেন এমন? চলুন, সেই অদেখা দুশ্চিন্তাগুলোকে একটু খোলাসা করে দেখি।

দুর্গাপূজা এলে বাঙালির মনে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তার মাঝে লুকিয়ে থাকে কিছু না বলা ভয়। পূজার আগে আমরা বেশিরভাগই ব্যস্ত থাকি পোশাক কিনতে, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে। কিন্তু পূজা আয়োজন যারা করেন, তাদের মাথায় যেন এক বিশাল পাহাড়ের ভার। আমরা যখন পূজার আনন্দে মাতোয়ারা, তারা তখন নির্ঘুম রাত কাটান নিরাপত্তা নিয়ে। মন্ডপে ব্যারিকেড দেন, পুলিশ মোতায়েন করেন, তারপরও তাদের চোখে ঘুম আসে না।

আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, এত ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন তাদের ঘুম আসে না? আসলে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কিছু অনিশ্চিত ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। বড় শহরগুলোতে মন্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র‍্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। তারা সর্বদা সতর্ক থাকেন যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে। কিন্তু তারপরও আয়োজকদের মনে এক অজানা আশঙ্কা কাজ করে। কারণ, মানুষের ভিড়, ভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা – এই সবকিছু মিলে মিশে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তার অবসান করা সবসময় এত সহজ নয়।

তাছাড়া, মন্ডপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আসলে আমাদের সমাজের অষ্টমঙ্গলা চিন্তাভাবনাও জড়িত থাকে। দুর্গাপূজার সময়কালে আমাদের সমাজে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাঝে মাঝে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সম্প্রীতির বাতাবরণের উপর কালিমালিপ্ত করে দেয়। এমনটি এড়াতে আয়োজকদের প্রতিনিয়ত সতর্ক থাকতে হয় এবং সেই সতর্কতা তারা নিশ্বাসে নিঃশ্বাসে পালন করেন।

মন্ডপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্য নিরাপত্তা। আপনি জানেন না, কিন্তু যেসব মানুষ মন্ডপের ভিতরে কাজ করেন, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাও আয়োজকদের দায়িত্বের অংশ। বেশিরভাগ মন্ডপে বোঝাই ভিড় হয়, আর এতে স্বাস্থ্যবিধি পালন করা একটু কঠিনই হয়ে পড়ে। সুতরাং, আয়োজকদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ যে, কীভাবে সকলের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।

এখনও যেসব আয়োজনকারীরা এই বিশাল দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের স্যালুট জানাই। তবে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি এই আয়োজকদের যথেষ্ট সমর্থন করি? তাদের কি সত্যিই আমরা যত্ন করি? শুধু পুলিশের অস্ত্র আর মন্ডপের ব্যারিকেড দিয়ে কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? আমাদের উচিত, নিজেদের মধ্যেও সেই সচেতনতা তৈরি করা, যাতে আমরা নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি। এর ফলে আয়োজকরাও কিছুটা হলেও নিশ্চিন্ত হতে পারেন।

আমি প্রায়ই ভাবি, আমাদের দায়িত্ব শুধু পূজায় আনন্দ উপভোগ করাই নয়, বরং আয়োজকদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সমর্থন করাও। আমরা যদি প্রতিটি মন্ডপে একটু সুসংগঠিত ও সচেতন থাকি, তাহলে হয়তো তাদের দুশ্চিন্তা কিছুটা হলেও কমবে। তারা বুঝবে, দর্শনার্থীরাও তাদের পাশে আছে এবং পূজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সবার সহযোগিতায় কাজ করছে।

বাঙালির এই উৎসব শুধু আনন্দের নয়, বরং এটি আমাদের ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রতীক। আমরা যদি নিজেদের মধ্যের বিভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে শিখি, তাহলে হয়তো মন্ডপের ব্যারিকেড আর পুলিশের অস্ত্রের প্রয়োজন কমে আসবে। আয়োজকদের চেহারায়ও সেদিন হাসি ফুটবে এবং তাদের চোখে ঘুম আসবে। তাই, আসুন আমরা নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হই এবং এ বছর পূজায় একটু ভিন্নভাবে আনন্দ উপভোগ করি। ভাবনা ছড়িয়ে দিন, যে উৎসব শুধুমাত্র আনন্দের জন্য নয়, বরং আমাদের একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর জন্যও।

উৎসবের এই আনন্দময় ক্ষণ যেন শুধুমাত্র আমাদের নিজেদের জন্য নয়, বরং সমগ্র সমাজের জন্য কাজে লাগুক। শুধু পূজার সময়ই নয়, বরং সারা বছর এই ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারলেই আমরা সত্যিকার অর্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারি। এই ঐক্যবদ্ধতা শুধু পূজাকে নয়, বরং আমাদের পুরো সমাজকেই করে তুলবে সুরক্ষিত এবং সুখময়। তাই, আমরা সবাই মিলে এই দায়িত্ব পালন করি এবং আমাদের উৎসবকে করি সত্যিকার অর্থে আনন্দময়।

By arindam