শিরোনামটা দেখেই একটু থমকে দাঁড়াতে হয়, তাই না? “পূজার সময় ছোটখাটো হামলাকে কেন ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়?” – খুবই জ্বলজ্বলে একটি প্রশ্ন, আর আমরা যারা বাংলাদেশে বসবাস করি, তাদের জন্য এই প্রশ্নটি খুবই প্রাসঙ্গিক। প্রতিবার পূজার মৌসুম এলেই আমরা দেখি নানা স্থানে ঘটে যাওয়া নানান ‘ছোটখাটো’ ঘটনা, যেগুলোকে অনেক সময়ই আমরা হয়তো গুরুত্ব দেই না, অথবা যারা এগুলো ঘটায় তারা ভিন্নভাবে প্রচার করে। কেন এমন হয়? চলুন, একটু গভীরে যাই।
বাংলাদেশের সমাজগত কাঠামো এবং ইতিহাস নিয়ে একটু ভাবলে বোঝা যায় যে আমাদের দেশে ধর্মের ভূমিকা কতটা বিস্তৃত। ইসলাম প্রধান দেশ হলেও, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ নানা ধর্মের মানুষের সহাবস্থান এখানে বহু যুগ ধরে। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত, বিভিন্ন সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবের সময় কিছু বিতর্কিত ঘটনা ঘটে যায়। আপনি হয়তো টেলিভিশনে বা সামাজিক মাধ্যমে দেখেছেন, কিংবা পড়েছেন যে কোনো একটি মন্দিরে মূর্তি ভাঙা হয়েছে, দুর্গাপূজার সময় অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনা ঘটার পর প্রায়শই শুনি – ও, এটা তো ছোটখাটো ঘটনা। গায়ে মাখার কিছু নেই। কিন্তু সত্যিই কি এটি গায়ে মাখার কিছু নয়?
এই ধরনের ‘ছোটখাটো’ ঘটনা কতটা সাংঘাতিক হতে পারে তা আমরা অনেকেই অনুভব করতে পারি না। একটি মূর্তি ভাঙার ঘটনা কেবলমাত্র একটি মূর্তির ক্ষতি নয়, এটি একটি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ধর্ম এবং বিশ্বাসের ওপর আঘাত। আর যখন এটি ‘স্বাভাবিক’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই ক্ষতিটা যেন বহু গুণে বেড়ে যায়। এটি কেবলমাত্র ফিজিক্যাল ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি মানসিক এবং সামাজিক স্তরেও আঘাত হানে।
একদিক দিয়ে ভাবলে, আমাদের সমাজের কিছু অংশের মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি একটা অবজ্ঞা বা উদাসীনতা কাজ করে। আর সেই উদাসীনতা থেকেই হয়তো আমরা এসব ঘটনা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাই না। কেউ বলে, রাজনীতি এর পিছনে কাজ করছে, কেউ বলে, অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে এগুলো ঘটানো হচ্ছে। কিন্তু আসল যে ব্যাপারটা, তা হলো এই ঘটনা সমাজে একটা ভয়াবহ বার্তা প্রেরণ করে। সংখ্যালঘু গোষ্ঠী যেন নিজেদের অনিরাপদ মনে করে, যেন তারা বুঝতে পারে যে তাদের কণ্ঠস্বরের কোনো দাম নেই।
এখন কথা হলো, কেন এগুলো স্বাভাবিক বলে ধরা হয়? এর পিছনে কি কোনো বড়ো কারণ লুকিয়ে আছে? আমি ভাবি, আমাদের সমাজের একটা বৃহত্তর অংশ এগুলোকে গুরুত্ব দিতে চায় না। হয়তো তাই, এসব ঘটনা ঘটলেই আমরা শুনতে পাই, এটা তো কিছু না, বড় কিছু ঘটেনি। আর যারা এগুলো ঘটায়, তারা জানে যে এসব ঘটনা নিয়ে তেমন কিছু করা হবে না। একপ্রকারের অপরাধবোধহীনতা কাজ করে তাদের মধ্যে। ফলে, তারা বারবার একই ধরনের কাজ করার সাহস পেয়ে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে, আমাদের সামাজিক দায়িত্ব কি হওয়া উচিত? আমি মনে করি, আমাদের নিজেদের ভেতর থেকেই এই ধারণাগুলো ভাঙতে হবে। আমরা যদি প্রতিটি ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করি, যদি বিষয়টা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করি, তবেই আমরা সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারবো। আমাদের সবাইকে মিলে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ধর্মের নামে কোনো হিংসা বা বিদ্বেষ থাকবে না। আর যেসব ঘটনা ‘ছোটখাটো’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
এই ধরনের ঘটনা যখন ঘটতে দেখি, তখন মনে হয়, কোন দিন কি এমন সময় আসবে, যখন এসব ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হবে? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি একটি শান্তিপূর্ণ এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের সমাজ দেখতে পাবে? আমাদের অবশ্যই কাজ করতে হবে এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে, কারণ এর ভিতরে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের সত্যিকারের উন্নতির সম্ভাবনা।
পূজা মানে আনন্দ, উৎসব, মিলনমেলা। আমরা যদি সত্যিই এই আনন্দটুকু সবার জন্য নিশ্চিত করতে চাই, তবে এসব সমস্যা নিয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। শুধু মুখে নয়, কাজে দেখিয়ে দিতে হবে যে আমরা সবাই সবাইকে সম্মান করি, ভালোবাসি। আর সেটাই হবে আমাদের ধর্মের প্রতি সত্যিকারের আনুগত্য। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই পরিবর্তনের জন্য তৈরি?
