তাঙ্গাইল, ফরিদপুর, কুড়িগ্রাম: এক মাসেই ১৪টির বেশি মূর্তি ভাঙা কাউকে কি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে?

আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে যদি কিছু লিখতে বসি, তবে প্রথমেই যে বিষয়টি মাথায় আসে তা হলো সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন প্রতিমা ভাঙার ঘটনা। বিশেষ করে তাঙ্গাইল, ফরিদপুর ও কুড়িগ্রামে এক মাসেই ১৪টিরও বেশি প্রতিমা ভাঙার ঘটনা আমাদের যেকোনো সচেতন নাগরিককে চিন্তায় ফেলতে বাধ্য করে। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ, যেখানে এক সময় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলে মিশে থাকতো, সেই সমাজে এখন এমন সহিংসতা? এই প্রশ্নই ঘুরেফিরে আসে মাথায়। আমরা কি এখনো সেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য অপেক্ষা করছি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের ঘৃণ্য কাজ করতে সাহস না করে?

যখনই এ ধরনের কোনো ঘটনার কথা শুনি, তখনই মনে প্রশ্ন জাগে কেন এমন হচ্ছে? আমাদের দেশের মানুষ তো আপনা-আপনি এতোটা হিংস্র হয়ে ওঠেনি। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে, হয়তো কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। কে জানে! কিন্তু যাই হোক না কেন, এর ফলাফল ভুক্তভোগীদের জন্য তো ভীষণ কষ্টের। যারা তাদের ধর্মীয় অনুভূতিকে রক্ষা করতে পারেনি, তাদের হৃদয়ের যন্ত্রণা আমরা কিভাবে অনুভব করবো? একবার ভেবে দেখুন তো, আপনার প্রিয় কোনো সংস্কার বা প্রথা যদি কেউ এভাবে ঝাঁজরা করে দেয়, তখন আপনার কেমন লাগবে?

আমাদের ইতিহাসের দিকে যদি তাকাই, তবে দেখতে পাবো আমরা সব সময়ই ধর্মীয় সহিষ্ণুতার জন্য পরিচিত ছিলাম। আমাদের সংস্কৃতিতে ভিন্নধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর অনুশীলন রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি যেন ঠিক তার উল্টো বলছে। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা যে বাড়ছে সেটা তো বলাই বাহুল্য। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা আমাদের সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে এটা কি আমরা চাই? মোটেই না।

এর আগে এই ধরনের ঘটনার পর আমরা বহুবার দেখেছি, বিষয়টি নিয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। “দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হবে,” “কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে” এরকম কথা শুনে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? ক’টুকুই বা সত্যি হচ্ছে?

আমি নিজেও এই পরিস্থিতির একটি প্রত্যক্ষদর্শী। আমার নিজের এলাকা তাঙ্গাইলে যখন প্রতিমা ভাঙার ঘটনা ঘটে, তখন চারপাশে একটা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। লোকজনের মধ্যে একটা অস্বস্তি কাজ করে। অনেকেই রাতের বেলা কেমন যেন শংকিত বোধ করে। এমন অনেক লোকের সাথে কথা বলেছি, যারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু এরপরও আমরা কি কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ দেখতে পাই?

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরনের অপরাধের পেছনে থাকা মানুষেরা কি তাহলে আইনের ফাঁকফোকরে বেরিয়ে যাচ্ছে? যদি তাই হয়, তাহলে তো এটা খুবই দুঃখজনক। আমাদের আইন এমন হওয়া উচিত যে, অপরাধীরা কোনোভাবেই রেহাই পাবে না। তারা নিশ্চই বুঝতে পারবে যে তাদের কাজের জন্য তাদের জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে।

আমরা সাধারণ মানুষ, আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অনেক সমস্যা থাকে। তার মধ্যে যদি এ ধরনের সামাজিক সমস্যাগুলোও যুক্ত হয়, তাহলে সার্বিকভাবে জীবন যাপন কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। আমরা কিভাবে উন্নতির পথে এগিয়ে যাবো, যদি আমাদের সামাজিক পরিসরে এ ধরনের অস্থিতিশীলতা থাকে?

এর একমাত্র সমাধান হতে পারে শক্তিশালী আইনের প্রয়োগ। যে আইনের বলে অপরাধীরা ভয় পাবে এবং তারা আর কখনো এ ধরনের কার্যকলাপের সাহস করবে না। আমাদের প্রশাসনকে এ ব্যাপারে আরও কঠোর হতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে আমাদের সমাজে একটা বার্তা পৌঁছে দিতে হবে যে, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা কোনোভাবে বরদাস্ত করা হবে না।

কিন্তু শুধু আইন প্রয়োগ করলেই কি সমাধান হবে? মোটেই না। আমাদেরকে সমাজে এনাজেন্ডাকে পাল্টাতে হবে। শিশুদের ছোট থেকেই শিক্ষা দিতে হবে, কিভাবে অন্যদের ধর্মীয় অনুভূতি শ্রদ্ধা করতে হয়। পরিবার, স্কুল এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি সহিষ্ণু সমাজ গড়ে তুলতে পারি।

তবে এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এ ধরনের সমস্যার সমাধান এক দিনে হবে না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারি।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেক্ষেত্রে প্রস্তুত? আমরা কি নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারব? যদি আমরা সচেতন ও সক্রিয় হই, তাহলে নিশ্চিতভাবে সমাজের পরিবর্তন সম্ভব। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, যেখানে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সামাজিক শান্তি বজায় থাকবে। আমাদের আইন, আমাদের প্রশাসন এবং সর্বোপরি আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধই পারে আমাদের এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে।

By amitav