নিরাপত্তা চেয়ে থানায় গিয়ে উল্টো হয়রানি: নভেম্বরের কয়েকটি আলোচিত মামলার ভেতরের কাহিনি

আমাদের সবারই জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তে পুলিশের সাথে কোনো না কোনোভাবে সংযোগ স্থাপন করতে হয়েছে। পার্কে হারিয়ে যাওয়া শিশুর খোঁজে হোক বা নিজের সুরক্ষার জন্য থানায় অভিযোগ জানাতে হোক, পুলিশ বাহিনী আমাদের রক্ষা করার জন্য তৈরি। কিন্তু কখনও কখনও এই সুরক্ষার আশ্রয়টাই আমাদের জীবনের জটিলতায় পরিণত হয়। আজ আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করবো নভেম্বর মাসের কিছু আলোচিত মামলা, যেখানে নিরাপত্তার জন্য থানায় গিয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হয়েছেন সাধারণ মানুষ।

একটি ঘটনা শুরুর দিকে খুব স্বাভাবিক মনে হলেও, তার পরিণতি ছিলো একেবারে ভিন্ন। ঢাকার একটি প্রখ্যাত এলাকায় বাস করা ফেরদৌসি আক্তার নামের একজন শিক্ষিকা থানায় গিয়েছিলেন তার স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করতে। ঘরোয়া নির্যাতনের অভিযোগ অনেকেই করছেন আজকাল এবং অনেক ক্ষেত্রেই মামলা দায়ের করলেই সমাধানের পথ খোলা হয়। কিন্তু ফেরদৌসি পুলিশ স্টেশনে গিয়ে দেখেন, অভিযোগ গ্রহণের পরিবর্তে তাকে বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। থানার কর্মচারীরা তার অভিযোগ গ্রহণ না করে, তাকে বিপরীতভাবে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করে। অবশেষে, তার অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি এবং তাকে থানার বাইরে চলে যেতে হয়।

আরেকটি ঘটনা ঘটেছে রাজশাহীতে। কলেজ পড়ুয়া এক কলেজ ছাত্র, রাস্তার ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়েছিলেন। ঘটনা যখন তিনি পুলিশকে জানাচ্ছিলেন, তখন পুলিশ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এমন কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল, যা ছিনতাইয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই ছিল না। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে বিভিন্নভাবে বুলি কাটতে থাকেন। ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে নিরাপত্তা চেয়ে এসে উল্টো এমন ব্যবহার পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন ওই ছাত্র।

এমন ঘটনা কিন্তু নতুন কিছু নয়। অনেকেই পুলিশকে আইনের রক্ষক মনে করেন, তবে অনেক ক্ষেত্রে তাদের আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হন। আমরা খবরের কাগজে প্রায়ই দেখি, কোথাও কোনো তরুণী ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে থানায় গিয়েছিল কিন্তু সেখানেও তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে উল্টো দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়েছে। কখনও কখনও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ গ্রহণ না করে তাদের হয়রানি করে। অপরাধীকে ধরা পড়ার বদলে, অভিযোগকারী ব্যক্তি নিজেই যেন এক অপরাধী বনে যায়।

এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে কয়েকটি কারণে। প্রথম কারণ হচ্ছে আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার, যা এই সব ঘটনার মূল কারণ। অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন না এবং তাদের হাতের ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করেন। এছাড়াও, কম প্রশিক্ষণ পাওয়া অনেক পুলিশকর্মী আছেন যারা তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে জানেন না। তাদের ট্রেনিংয়ের অভাবের ফলে তারা জানেন না কীভাবে সঠিকভাবে অভিযোগ গ্রহণ করতে হয় বা কীভাবে ভুক্তভোগীর সাথে আচরণ করতে হয়।

আরেকটি প্রভাবশালী কারণ হচ্ছে, আইনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস এবং মুক্তভাবে অভিযোগ করতে পারার পরিবেশের অভাব। অনেকেই মনে করেন যে অভিযোগ করে কোনও লাভ হবে না বরং উল্টো তারাই হয়রানির শিকার হবেন। পুলিশ যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে, সেটা অনেক সময় ভুলে গিয়ে তারা নিজেদের স্বার্থের দিকে বেশি মনোযোগ দেন।

আমাদের দেশের পুলিশ প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ এবং সচেতন হতে হবে। তাদের ট্রেনিং প্রোগ্রামগুলোকে আরও উন্নত করতে হবে যাতে তারা ভুক্তভোগীদের সাথে মানবিক আচরণ করতে পারে। অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়াকে পূর্ণ স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে তাদের সমস্যার সমাধান পেতে পারে। একই সাথে, সাধারণ মানুষের জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে হবে যাতে তারা জানে তাদের অধিকার কী এবং কীভাবে তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারে।

এই ঘটনাগুলির কারণে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, তাহলে আমরা আমাদের নিরাপত্তার জন্য কোথায় যাবো? কার কাছে যাবো? যদি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আমাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমাদের অবস্থা কী হবে? আমাদের সমাজের জন্য এই প্রশ্নগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর উত্তর না পেলে সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে।

তাই এইসব ঘটনাগুলি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সমাজকে পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা যদি আমাদের সিস্টেমকে ঠিক করতে পারি, তাহলে একদিন নিশ্চয়ই আমরা এমন একটি সমাজ পাবো যেখানে থানায় গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হবে না বরং সঠিক নিরাপত্তা পেতে পারবো। এই পরিবর্তনের জন্য আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে, নিজেদের অবস্থান থেকে সচেতন থাকতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আপনার মতামত কী? আমরা কি পারবো নিরাপত্তার আশ্রয়কে হয়রানিমুক্ত করতে?

By laboni