আমাদের দেশটা উৎসবপ্রিয়। বছরজুড়ে নানা রকম উৎসবের মধ্যে ডুবে থাকি আমরা। বৈশাখ আসে গায়ের রঙিন পাঞ্জাবি আর শাড়ি নিয়ে, পূজাতে মা দুর্গার বিসর্জনের সুর বাজে কানে, আর ক্রিসমাসে মোমবাতির আলোয় নাচে মন। কিন্তু আজকাল উৎসব বলতে নতুন করে কিছু ভয়ও যেন অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবনে। আপনি কি কখনো খেয়াল করেছেন, প্রতিটা উৎসব আসার আগে কিছু অপ্রত্যাশিত আতঙ্ক যেন আমাদেরকে টার্গেট করে বসে?
বৈশাখ এলেই বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা, এত কিছুর মাঝে যেন নিরাপত্তার ছায়ায় কাঁপতে থাকে আমাদের মন। অনেকটা একধরনের মানসিক চাপের মতো। যেখানে আনন্দের চেয়ে চিন্তার দিকটাই যেন বড় হয়ে উঠছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে হাজার হাজার মানুষের মিলনমেলা, সেখানে কত রংবেরঙের মানুষ, কত রকমের মুখাবয়ব। কোনো উৎসবের আগে আগে আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন, একটু সাবধান থাকবেন, অনেক ভীড় হবে, চুরি-ছিনতাই হতে পারে। এই কথাগুলো আমাদের মধ্যে ভালো লাগার বদলে ভয় ঢুকিয়ে দেয়।
পূজা আসে শঙ্খধ্বনি আর ঢাকের বাদ্য নিয়ে। অথচ সেখানে পুরো সময়টাই যেন কাটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তায়। মণ্ডপে মণ্ডপে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কায় মাথা কুঁচকে থাকে। কতজন নিরাপত্তারক্ষী আছে, কোথায় কোথায় সিসিটিভি বসানো হয়েছে এটাই যেন প্রধান আলোচ্য বিষয়। এমনকি সামান্য পুষ্পাঞ্জলির সময়েও চোখ কেমন স্বভাবতই চারদিকে ঘুরে বেড়ায়, যদি কিছু ‘অন্যরকম’ ঘটে যায়।
ক্রিসমাসের সময় আমাদের খ্রিষ্টান বন্ধুরা গির্জায় শান্তিতে প্রার্থনা করতে পারেন না। তারা জানেন, বাইরে একদল পুলিশ, নিরাপত্তা কর্মী ব্যস্ত তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। এ যেন প্রকৃত আনন্দ থেকে দূরে রাখার এক প্রকার ষড়যন্ত্র। আনন্দের বদলে আতঙ্ক যেন তাদের মনে দাগ কেটে যায়। আপনি যদি কোনো বন্ধু বা পরিবারের সাথে বের হন, মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে, গলিতে গলিতে পুলিশ আর র্যাবের উপস্থিতি। এমনিতেই ক্রিসমাসের সময় চারপাশে আলো ঝলমলে থাকে, কিন্তু সেই আলোর নিচে যদি এত নিরাপত্তার ভাবনা মাথায় ঢোকে, তাহলে সেই আবেগটা কোথায় থাকে?
এখন প্রশ্ন আসে, আমরা কি এমন একটি সমাজে বাস করছি যেখানে আনন্দ মানেই আতঙ্ক? না কি আসলে আমাদের মনের মধ্যেই এই ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে? মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার পেছনে কি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য কাজ করছে? হয়তো না, কিন্তু হয়তো হ্যাঁও হতে পারে। খেয়াল করলে দেখবেন, ছোটো ছোটো বাচ্চারাও এখন জেনে গেছে উৎসব মানেই ভীড়, আর ভীড় মানে সাবধানতা।
এই ভয়ের সংস্কৃতি আমাদের সামাজিক জীবনে ভয়ানকভাবে প্রভাব ফেলছে। আমরা একে অপরের ওপর বিশ্বাসে ভাঙন ধরাচ্ছি। কেউ যদি আজকে আপনাকে কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়, আপনি প্রথমে জিজ্ঞেস করবেন, নিরাপত্তার ব্যবস্থা কেমন? এটি কি সত্যি আমাদের চাওয়া? আমরা কি একটি নিরাপদ সমাজে বাস করতে চাই না যেখানে উৎসব মানেই নিঃশর্ত আনন্দ?
আমাদের এই আতঙ্কের কারণ কি শুধুই নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব, না কি এর পিছনে আছে সামাজিক অবক্ষয়ের হাতছানি? আমরা কি সত্যিই জানি আমাদের সমাজের ভিতরকার দুর্বলতা কোথায়? সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে একদল মানুষের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে অপরাধপ্রবণতা, আর তার ছোঁয়া লেগে যাচ্ছে আমাদের নিরাপদ উৎসবের আয়োজনেও।
এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নিজের দিকে তাকাতে হবে। আমাদের সমাজের ভিতরের সমস্যা গুলো ভালোভাবে চিহ্নিত করতে হবে। আর সেই সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। অন্যথায় আমরা আমাদের সুন্দর উৎসবগুলো একসময় শুধু আতঙ্কের কারণে হারিয়ে ফেলতে পারি।
উৎসব মানেই টার্গেট হওয়া আমাদের সমাজের সত্যিই একটি বিপর্যয়। এখন প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ছোটো ছোটো ঘটনায় আমাদের সাহায্য করতে হবে একটি নিরাপদ এবং আনন্দময় সমাজ গড়তে। আপনি আপনার চারপাশের মানুষকে সচেতন করুন, সতর্ক করুন। যতক্ষণ না আমরা সবাই মিলে এই পরিবর্তন আনতে পারি, ততক্ষণ আমাদের এই আতঙ্ক থেকে মুক্তি মিলবে না।
উৎসবের সময় নিরাপত্তার চিন্তা নিশ্চয়ই প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন আমাদের আনন্দ কেড়ে নেওয়ার কারণ না হয়। আশা করি, একদিন আমরা এমন একটি সমাজ পাবো যেখানে উৎসব শুধুই আনন্দের প্রতীক হবে, কোনোরকম আতঙ্কের নয়। আমাদের সকলের প্রচেষ্টা যেন সেই দিনটাকে সামনে নিয়ে আসে। প্রশ্ন এই যে, আপনি কি সেই দিনটাকে সামনে নিয়ে আসার জন্য প্রস্তুত?
