কি অবাক হচ্ছো? আমি জানি, এই শিরোনামটা পড়লে তোমার মাথায় প্রথমেই যা আসতে পারে, তা হলো “কেন সেনা-পুলিশ মোতায়েন, এতো নিরাপত্তার কিসের দরকার?” বাংলাদেশের বাস্তবতা তো আমরা সবই জানি, রাজনীতির মাঠে, রাস্তার মোড়ে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা হতেই থাকে। কিন্তু কি জানো, আমাদের দৃষ্টির অগোচরে কত গুরুত্বপুর্ন বিষয় থেকে যায়? আজকে সেই বিষয়টাই তুলে ধরব, যাতে আমাদের চোখের পর্দাটা একটু সরিয়ে ফেলা যায়।
আমাদের দেশে যখনই কোন বড় রাজনৈতিক ইভেন্ট বা জনসভার কথা ওঠে, তখনই সাধারণত একটা দুশ্চিন্তা মাথায় আসে, “আবার কিছু ঘটবে না তো?” সহিংসতা যেন অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমরা। এমন পরিস্থিতিতে যদি বড় ধরনের জনসমাগম হয়, তাহলে সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করাটা হয়তো একরকম স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই হেভি সিকিউরিটি দিয়ে কি সব সমস্যার সমাধান হচ্ছে? নাকি এটা শুধুই একটা অস্থায়ী ব্যবস্থা, যা মূল সমস্যাকে আড়াল করছে?
আমরা যদি একটু পেছনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সহিংসতা ঘটেছে। কখনো রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষ, কখনো ধর্মীয় বিদ্বেষ, কিংবা কখনো সন্ত্রাসী হামলা। এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা অবশ্যই জরুরি। সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করে হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষের পাশে থাকা যায়। কিন্তু বাস্তবতা কি জানো? এতে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা থেকেই যায়।
আরেকটা জিনিস ভেবে দেখেছো কি? প্রতিবার নতুন কোন ঘটনা ঘটলে আমরা কতটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি, অথচ পুরোনো ঘটনা নিয়ে আর কথা বলি না। পুরোনো মামলাগুলোর কী অবস্থা? অপরাধীরা কি শাস্তি পাচ্ছে? ন্যায়বিচার কি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই অনুচ্চারিত থেকে যায়। আর এই যে আমাদের বিচার ব্যবস্থা, সেটাও তো একেবারে ফুলপ্রুফ না। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পায় না।
আমার মনে হয়, এই সমস্যার মূল কারণ হলো আমাদের সমাজে ন্যায়বিচারের যে অভাব, সেটা শুধু বিচার ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল নয়। আমাদের সংস্কৃতিতেও এই অভাব রয়েছে। আমরা সহিংসতার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে যতটা চিন্তিত থাকি, পুরোনো সমস্যাগুলোর সমাধানের ব্যাপারে ততটাই উদাসীন। এটা একটা বড় সমস্যা। এর সমাধান কি? আমাদের উচিত বর্তমান ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি পুরোনো ঘটনাগুলোর বিচার সম্পন্ন করা। যেন অপরাধীরা শাস্তি পায় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।
তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছো, অনেক সময় দেখা যায়, সহিংসতার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়, কিন্তু কিছুদিন পর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। এটা একটা অস্থায়ী সমাধান, যা শুধু বর্তমানের সমস্যা মোকাবেলা করে, ভবিষ্যতের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয় না। আমাদের উচিত এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচার ব্যবস্থা সংস্কার করতে হবে, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
এটা শুধুমাত্র সরকারের দায়িত্ব নয়। আমাদের সমাজের সকলস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ করতে হবে। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ এমন হতে হবে যে সহিংসতা বা অপরাধ করার আগে মানুষ একশবার ভাববে। তবেই সম্ভব হবে একটা সুষ্ঠু ও নিরাপদ সমাজ গঠন করা।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একান্তভাবে শুধু নিরাপত্তার উপর নির্ভর করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হলে সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধোপে টিকবে না। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই পথে হাঁটতে প্রস্তুত? সঠিক পথে এগিয়ে যেতে চাইলে আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আমরা কি সেই জন্য প্রস্তুত?
