শীতের রাতে শরণার্থীজীবন: পোড়া ঘর ছেড়েস্কুল–মন্দিরে ঠাঁইপাওয়া হিন্দুপরিবারগুলো
ডিসেম্বরের ঠাণ্ডা হাওয়া যখন কাঁপিয়ে দিচ্ছে আমাদের গা, তখন আমি বসে আছি চায়ের দোকানে। চায়ের কাপে উষ্ণতা পেয়ে একটু স্বস্তি পাচ্ছি। কিন্তু আমার চিন্তায় ঘুরঘুর করছে সেই হিন্দুপরিবারগুলির কথা, যারা বর্বর হামলার শিকার হয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বর্তমানে স্কুল আর মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের জীবনে এই শীতের রাতগুলো কেমন কাটছে সেটা ভাবতেই গা শিরশির করে ওঠে। ভাবতে অবাক লাগে যে, এমন এক দেশে আমরা বাস করি যেখানে ধর্মের নামে এতোটা নৃশংসতা ঘটে।
আমরা বরাবরই গর্ব করি যে বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। কিন্তু এই গর্ব কি শুধুই কাগজের পাতায়? আমাদের চারপাশে ঘটে চলা ঘটনা কি সত্যিই আমাদের সেই গর্বের ভিত্তিকে মজবুত করছে? ভাবতে অবাক লাগে যখন শুনি যে, কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর এভাবে হামলা হতে পারে। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, প্রাণের ভয়ে কোথাও পালিয়ে বেড়ানো – এ যেনো যুদ্ধক্ষেত্রের কোনো করুণ প্রান্তছবি। কিন্তু আমাদের তো এই যুদ্ধের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তো শান্তিতে বাস করতে চাই সবাইকে নিয়ে!
আমি যখন এইসব ভাবছি, তখন আমার চোখে ভাসছে সেই শিশুদের মুখ। যাদের হাতে খাতাপত্র থাকার কথা, তারা আজ একটি স্কুলের ক্লাসরুমে বসে ঠাণ্ডায় কাঁপছে। তাদের চোখে ভয়ের ছায়া, কিন্তু তবুও মনে সাহস একটুখানি। তারা জানতে চায়, কেন তাদের এমন করতে হলো, কেন তাদের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হলো, কেন তাদের জীবন হঠাৎ করেই এমন অনিশ্চিত হয়ে গেল। আমি কি এর উত্তর দিতে পারবো? না, আমার মতো অনেকেই পারবে না হয়তো।
এই পরিস্থিতি আমাদের সামাজিক অবস্থার গভীরতর সংকটকে তুলে ধরে। আমাদের সমাজের মধ্যে যে সহিষ্ণুতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব, তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখতে পাই এমন ঘটনা। আমাদের প্রশাসন হয়তো কিছু করছে, হয়তো তারা বলে যে তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। প্রশাসনের কার্যকারিতা এবং আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।
আমাদের দেশের সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক দল – তাদের প্রত্যেকেরই এসময় এগিয়ে আসা উচিত এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য। কিছুদিনের আগে আমি এক বন্ধুর সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। সে বলেছিল, “যদি আমরা তাদের পাশে না দাঁড়াই, তাহলে কে দাঁড়াবে?” সত্যিই তো, আমরা যদি আমাদের সহনাগরিকদের জন্য কিছু করতে না পারি, তাহলে আমাদের দায়িত্ববোধ কোথায়? সেই বন্ধুটি নিজে গিয়ে এই পরিবারগুলোর জন্য কিছু ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে এসেছিল। তার এই উদ্যোগ দেখে আমার মনে হলো, হয়তো আমরা সবাই মিলে কিছু করতে পারলে, এই পরিবারগুলোর কষ্ট কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার যে, এই পরিস্থিতিতে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা আমাদের একদমই ভুলে গেলে চলবে না। তারা যে মানসিক আঘাত পেয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। তাদের পাশে থাকতে হবে আমাদের, যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। আমরা যদি তাদের মানসিক ভরসা দিতে পারি, তাহলে হয়তো তারা এই কঠিন সময়টা কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে আমরা একটি নাটক করেছিলাম, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের একতাবদ্ধ জীবনযাপন তুলে ধরা হয়েছিল। নাটকের শেষে আমি দর্শকসারিতে বসে কাঁদছিলাম, এমনকি সেটার অভিনয় ছিল জানার পরেও। আজকে যখন বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটতে দেখি, তখন সেই নাটকের স্মৃতি বেশ জ্বলজ্বল করে ওঠে। আমরা কেনো সেই একতাবদ্ধ, বাসোপযোগী সমাজ গড়ে তুলতে পারছি না?
এই শীতের রাতে, যখন আমি নিজের গরম বিছানায় শুয়ে আরাম পাই, তখন মনে হয় যে, এরকম অনেকেই আছেন যারা সেই আরামের থেকে বঞ্চিত। আমাদের সবাইকে মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে, আমাদের সাধ্যানুযায়ী যা পারি তাই দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমরা কি লেখালেখি করে, কিছু অর্থ সংগ্রহ করে, ত্রাণ বিতরণ করে অথবা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারি না?
একটা প্রশ্ন রয়ে যায়, আমরা যদি আগামী প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর সমাজ রেখে যেতে চাই, তাহলে কি আমাদের এখনই সচেতন হয়ে কিছু করা উচিত নয়? এখনই কি সময় নয়, এইসব বিদ্বেষপূর্ণ কাজকে চিরতরে বন্ধ করার? আমার মনে হয় এখনই সময়, এবং সেই কাজে নিজেকে জড়াতে হবে আমাদের প্রত্যেককেই। নাহলে হয়তো একদিন এই শীতে আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে আমাদের সেই অসম্পূর্ণ দায়বদ্ধতা নিয়ে অনুশোচনা করতে হবে।
