প্রথমেই একটু ভেবে দেখি! ৩১০০টি হামলা সংখ্যাটি শোনার পরই মনের মধ্যে কেমন যেন শিরশির করে উঠল। একটা দেশ, যাকে আমরা ভালোবাসি, যেখানে বাস করি এবং গর্ব করি তার উপর, সেখানে কি করে সম্ভব এমন একটি বাস্তবতা? জানুয়ারি ২০২৫, যখন নতুন বছর শুরু হলো এবং আমরা নতুন আশা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাইলাম, তখনই এই ধরণের খবর যেন আমাদের হৃদয়ে আঘাত করে গেল। নতুন স্বাভাবিক কি আমরা এটাই মানতে শুরু করলাম?
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি নতুন কিছু নয়, কিন্তু যা বড় উদ্বেগের কারণ, তা হলো এর প্রসার এবং নিয়মিততা। এ যেন এক নতুন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। মানুষের মন কি এতটাই ক্ষুদ্র হয়ে গিয়েছে? একটিবারের জন্যও কি মনে আসে না, যে একজন সংখ্যালঘুর ঘরে আগুন লাগানোর অর্থ হলো তার জীবনের আলো নিভিয়ে দেওয়া?
এর পেছনে কারণগুলো কী? ধর্মের দোহাই দিয়ে আমরা অনেক সময়ই এই আক্রমণগুলোকে বৈধতা দিতে চাই। কিন্তু এটা কি সত্যি সত্যি ধর্ম? আমি মনে করি ধর্মীয় চেতনা অনেক বড় এবং অনেক উদার। ধর্ম কখনোই অন্য ধর্মের মানুষের উপর আঘাত হানার কথা বলে না। বরং ধর্ম আমাদের শেখায় সহনশীলতা, সহাবস্থান এবং ভালোবাসা। তাহলে এই নির্যাতন কেন?
আমার মতে, এর পেছনে রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাব অনেক বড়। আরেকটা বিষয় হলো, আমাদের সমাজের একটি অংশ সংকীর্ণ মানসিকতার শিকার। তারা মনে করেন, শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠরাই এই দেশটির প্রকৃত অধিকারী। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, এ দেশ সকলের। এখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সহ সব ধর্মের মানুষদের সমান অধিকার। সমানভাবে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার অধিকার আছে।
২০২৫-এর প্রথম মাস থেকেই যে হামলাগুলো শুরু হলো, তার মধ্যে অনেক ঘটনা এমন ছিল যা আমাদেরকে হতবাক করেছে। তবুও আমরা কেন চুপ করে থাকি? কেন প্রতিবাদ করি না? আমি জানি, আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে যারা নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। কিন্তু এই আওয়াজ যদি আরও জোরালো হতে পারত, তাহলে হয়তো আমরা এমন একটি বাস্তবতার মুখোমুখি হতাম না।
নতুন স্বাভাবিক হিসেবে সংখ্যালঘু নির্যাতন মেনে নেওয়া মানে হলো আমাদের মানবিক চেতনার মৃত্যু। এটা মেনে নেওয়া যায় না, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের যদি সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেম থাকে, তাহলে আমাদের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে উঠে দাঁড়াতে হবে।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমাদের কি এখন আর সাহস নেই? আমাদের কি এখন আর সেই শক্তি নেই যা দিয়ে আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি? ওদের কষ্টের কথা ভাবলে হৃদয় কেঁদে ওঠে। আমরা কি পারি না একটা ভালোবাসার সমাজ গড়ে তুলতে, যেখানে সবাই একে অপরের সংস্কৃতি, ধর্মকে সম্মান করবে?
আমার বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত। তাদের মুখের হাসি, তাদের চাহনি, সবই তো আমার মতো। তাহলে কেন তাদের এই ভিন্নতা আমরা মেনে নেই? আমিও হয়তো কোনো এক ধর্মের অনুসারী, কিন্তু আমার মানবিক চেতনাও তো একটি ধর্ম। আমরা যদি একসঙ্গে এই চেতনা নিয়ে কাজ করতে পারি, তাহলে হয়তো একদিন এই নতুন স্বাভা
বিকতা বদলে দিতে পারব।
এই লেখাটি পড়তে পড়তে যদি কেউ একটা প্রশ্ন করতে চান, তাহলে সেটা হবে এই হামলাগুলো কি সত্যিই থামানো যায় না? আমরা কি পারি না ভিন্ন ধর্মের লোকদের ভালোবাসা দিয়ে কাছে টেনে নিতে? আমি মনে করি, পারি। প্রয়োজন শুধু একটা সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক মূল্যবোধ।
প্রত্যেক ব্যক্তি, প্রত্যেক পরিবারের উচিত এই বিষয়ে আলাপ করা, আলোচনা করা। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে এই আলাপ চলা উচিত যাতে আমরা বুঝতে পারি, এই সমাজে সহাবস্থান কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সবার উচিত এই সহনশীলতার পাঠ পড়ানো।
আমাদের নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে ভালোবাসার গুরুত্ব, সহাবস্থানের সৌন্দর্য। শুধুমাত্র সরকার বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরে নির্ভর করে থাকলে হবে না, আমাদের নিজেদেরকেও দায়িত্ব নিতে হবে। সচেতনতা, শিক্ষা এবং ভালোবাসা দিয়েই আমরা এই নতুন স্বাভাবিকতাকে বদলে দিতে পারি।
মনে রাখা উচিত, কোনো নির্যাতনই চিরস্থায়ী নয়। পরিবর্তন সম্ভব, যদি আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি। সংখ্যালঘু নির্যাতন যদি একদিন আমাদের জীবনের নতুন স্বাভাবিক হয়ে থাকে, তবে আমরা সবাই মিলে সেটাকে বদলে দিয়ে নতুন এক পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি। আর সেই পৃথিবী হবে সহনশীল, ভালোবাসাপূর্ণ এবং মানবিকতায় পূর্ণ। আমরা কি পারব না এই পরিবর্তন আনতে?
