আমি ঠিক জানি না আপনারা কীভাবে এই বিষয়টি দেখেন, কিন্তু প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রের পাতা উল্টালে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে একটি সাধারণ দৃশ্য আমরা প্রত্যক্ষ করি। একটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, মানুষ ভুক্তভোগী হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হচ্ছে যে, “এইসব ঘটনা ব্যক্তিগত শত্রুতা”। এ যেন এক ক্লাসিক ফর্মুলা, যা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের সামনে পরিবেশিত হয়। কিন্তু সত্যিই কি এটি শুধুমাত্র ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’ বলতে কিছু আছে, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গভীরতর সমস্যা?
প্রথমে আসি প্রশাসনের ভাষ্যে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রায়শই বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলেই তার পেছনে ব্যক্তি বিশেষের ব্যক্তিগত বিরোধ কাজ করছে। এর মানে হল, ভুক্তভোগী এবং অপরাধীর মধ্যে আগে থেকেই কোনো তিক্ত সম্পর্ক ছিল। এটা শুনে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, যদি এটা ব্যক্তিগত শত্রুতা হয়েও থাকে, তবে কেন প্রশাসন তা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না? সব কিছু কি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত আক্রোশেই সীমাবদ্ধ থাকে?
ব্যক্তিগত শত্রুতা অবশ্যই সমাজের একটি বড় সমস্যা, বিশেষ করে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে। পারিবারিক পূর্ব-শত্রুতা, জমি-জমার বিরোধ, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা সবই এই শত্রুতায় পরিণত হয়। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্ব হলো একদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, অন্যদিকে জনগণকে সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার পথ সুগম করা। কিন্তু যখন আমরা দেখি প্রশাসন এসব ঘটনাকে ব্যক্তিগত শত্রুতা হিসেবে চিহ্নিত করে হাত গুটিয়ে নেয়, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমরা কি সত্যিই সঠিক বিচার পাচ্ছি?
ভুক্তভোগীর দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে ব্যক্তি কোনো সমস্যায় পড়েছেন, তার কাছে এই ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’ তত্ত্ব একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা চায় কার্যকর পদক্ষেপ, তারা চায় নিরাপত্তা এবং তারা চায় বিচার। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, প্রশাসন যদি সবকিছুকেই ব্যক্তিগত শত্রুতা বলে চালিয়ে দেয়, তবে কে তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে? আর প্রশাসন যদি সত্যিই বিশ্বাস করে যে এটি ব্যক্তিগত শত্রুতা, তবে কেন তারা তা সমাধান করতে পারছে না?
আমরা যারা সাধারণ জনগণ হিসেবে দিন কাটাই, তাদের জন্য এই বিষয়টি চিন্তাভাবনার কারণ। সমাজের কাঠামোতে এই ধরনের ঘটনার পুনঃঘটন আমাদের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের মাথাব্যাথার কারণ হওয়া উচিত। এটি আমাদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় আহ্বান যে, আমরা কেবলমাত্র প্রশাসনের উপর নির্ভর করে থাকতে পারি না। আমাদের নিজেদেরও সচেতন হতে হবে এবং এইসব ব্যক্তিগত শত্রুতা সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে।
আরেকটি বিষয় যা আমাকে বেশ চিন্তায় ফেলে দেয়, সেটি হলো প্রশাসনের এই কথিত ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’ তত্ত্বের পেছনে আসলে কি কোনো শিথিলতা আছে কিনা। প্রশাসনের কাজ কি কেবলমাত্র ঘটনার পেছনে দোষারোপ করে খালাস হয়ে যাওয়া? যদি তাই হয়, তবে আমাদের প্রশাসন কতটা কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। তাদের কাজ শুধুমাত্র ঘটনার তদন্ত করা নয়, বরং সেই ঘটনার সমাধান করা, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।
এখানে আমাদের আইন ব্যবস্থা এবং প্রশাসনকে একযোগে কাজ করতে হবে। ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করতে হবে। কেবলমাত্র ব্যক্তিগত শত্রুতা বলে চালিয়ে দিলে যে দায়িত্ব শেষ হয় না, তা প্রশাসনকে বুঝতে হবে। আমাদের সমাজের স্থিতি এবং শান্তি নির্ভর করছে এই বিষয়গুলোতে প্রশাসনের কার্যক্রমের উপর।
তো, আমাদের কি করা উচিত? আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সমাজের প্রত্যেকটি সদস্যের সঙ্গে আমাদের শত্রুতা হোক বা বন্ধুত্ব, প্রশাসনের দায়িত্ব হল সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। যদি এটি ব্যক্তিগত শত্রুতা হয়ও, তবে তা নিরসনে প্রশাসনের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া উচিত নয়। প্রশাসনের ভূমিকা কি শুধুমাত্র বিদেশি ধারণা প্রচার করা, নাকি আসল কাজকর্মে নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শন করা? আমার ব্যক্তিগত মতামত হল, প্রশাসনের উচিত এই ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’ তত্ত্বের বাইরে এসে একটি কার্যকরী সমাধানের পথ খুঁজে বের করা যাতে ভুক্তভোগীরা প্রকৃত সুরক্ষা এবং বিচার পেতে পারে।
আমাদের সমাজে অনেক কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন। প্রশাসনের ভূমিকা শুধুমাত্র শাসন নয়, বরং জনগণের বিশ্বাস অর্জন করার জন্যও তাদের কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা এবং কার্যকারিতা আনতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব হল প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করা যাতে তারা কেবলমাত্র বলার জন্য নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে কাজ করার জন্য উৎসাহিত হয়। এই ধরনের ঘটনা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, বরং সমাজের সকল স্তরে নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশাসনের ব্যর্থতা নির্দেশ করে। আসুন আমরা সকলে মিলে একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে তুলি যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি অনুভব করবে যে তারা সুরক্ষিত এবং নিরাপদ। আপনাদের কী মনে হয়?
