বন্ধুরা, একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি, কি বলেন? মনে করেন, আপনার গ্রামের মন্দিরটা হঠাৎ একদিন জ্বলতে শুরু করলো। আগুনের পরেও একধরনের নীরবতা রয়ে গেল। আরেকদিকে, ফেসবুকে একটি পোস্ট দিলেন নিজের মতামত জানাতে। পরের দিনই দেখলেন আপনার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে। এই দুই পরিস্থিতি একসাথে ঘটে গেলে আপনিই বলুন, এ কোন দেশ? রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার কি শুধু সেই ফেসবুক পোস্টে সীমাবদ্ধ, না কি মন্দির পোড়ানোর মতো গর্হিত কাজেও তাদের দৃষ্টি রয়েছে? আজকের লেখাতে আমরা এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলবো।
আপনি জানেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ভিশন ঘোষণার মধ্য দিয়ে। এটা এমন একটা স্বপ্ন ছিল যেখানে দেশের অর্থনীতি এবং সমাজকে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। ভিশনের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা। এখন প্রশ্ন হলো, এই ডিজিটাল রূপান্তর কি সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমানভাবে বিস্তৃত হয়েছে? যেমন মন্দির পোড়ানোর ঘটনায় কি কোনো রূপান্তর হয়েছে বা হবে?
২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) দেশের প্রথম ৩জি লাইসেন্স প্রদান করে, এবং তারপরে ২০১৫ সালে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে ইন্টারনেট সুবিধা প্রদান শুরু হয়। ২০১৮ সালে সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ বৃদ্ধি পেলো। সব মিলিয়ে, দেশের প্রায় ১২ কোটিরও বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে এখন। কিন্তু এই ইন্টারনেট মানুষের নিরাপত্তা এবং সমতার ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর?
যে দেশে ১৮ কোটি মোবাইল ফোন গ্রাহক থাকার পরেও মন্দির পোড়ানোর মতো ঘটনায় অপরাধীরা রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে, সেখানে আমরা কি বলতে পারি যে আমাদের ডিজিটাল রূপান্তর একেবারে সফল হয়েছে? রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার যদি শুধু ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষুদ্র অংশে সীমাবদ্ধ থেকে যায়, তবে সেই রূপান্তরের সার্থকতা কতটুকু?
ডিজিটাল রূপান্তরের একটি আশীর্বাদ যে ই-কমার্স খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২২ সালে, বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আশার আলো। তবুও, সমাজের সব স্তরে এই রূপান্তর পৌঁছাতে পেরেছে কি? আর যদি পেরেও থাকে, তবে কেন মন্দির পোড়ানোর মতো গর্হিত কাজ এখনও সময়মতো শাস্তি পায় না?
শিক্ষার ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন অনেকটাই ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপক প্রচলিত হয়েছিল। কিন্তু সেই ডিজিটাল শিক্ষাও তো সেই ক্ষুদ্র অংশের জন্যই প্রযোজ্য ছিল যারা ইন্টারনেট এবং ডিভাইস ব্যবহারের সুবিধা পায়। গ্রামের যে শিশু কেবলমাত্র তার বাবার ফোনে গেম খেলে, সে কি ডিজিটাল বাংলাদেশের আসল স্বপ্ন দেখতে পেরেছে?
আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশ অনেক দিক থেকে সফল হতে পারে, কিন্তু তবুও মনে হচ্ছে এর কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে। যেমন ডিজিটাল বৈষম্য এবং সাইবার নিরাপত্তা। এই বৈষম্য রেখা টেনে দেয় রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার কোথায় আর সেখানেই প্রশ্ন ওঠে, ফেসবুকে একটি পোস্টের জন্য মামলা হতে পারে, তবে মন্দির পোড়ানোর ঘটনায় শাস্তি পেতে এত দেরি কেন?
আমাদের এই রাষ্ট্র কি সত্যিই সবার জন্য এক? না কি কিছু বিষয় এখনও রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের আড়ালে থেকে গিয়েছে? আমাদের ডিজিটাল রূপান্তর যখন এত দূর এগিয়েছে, তখন কেন মন্দির পোড়ানোর মতো অপরাধীরা ফ্রিতে ঘুরে বেড়াবে?
এই প্রশ্নগুলো থেকে মুক্তির উত্তর কি রাষ্ট্র দেবে, না কি আমাদেরই কিছু করতে হবে? আপনিই বলুন, মন্দির পোড়ালে কেন শাস্তি নেই? আর একটি পোস্ট দিলেই কেন মামলা হয়? রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার কি সত্যিই সমানভাবে ভাগ করা যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হয়তো আমাদেরই দায়িত্ব, যদি আমরা সত্যিকার অর্থে ডিজিটাল বাংলাদেশকে সফলভাবে দেখতে চাই।
