“হামলার পর গ্রামে‘সামাজিক বয়কট’: দোকানে বেচাকেনা বন্ধ, কূপের পানি বন্ধ, স্কুলেযাওয়া নিষেধ” এই শিরোনামটি পড়ে তো আমি একেবারে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। অজানা একটা অস্বস্তি আমার মনকে আচ্ছন্ন করেছিল। সাধারণত আমরা সবাই এমন একটা সমাজের স্বপ্ন দেখি যেখানে প্রত্যেকে নিরাপদ, যেখানে কেউ অন্যায়ের শিকার হলে তার পাশে দাঁড়ায় পুরো সমাজ। কিন্তু বাস্তবতা কখনো কখনো এমন হয় যে, আমরা আশেপাশের লোকদের দ্বারা অবহেলিত ও বর্জিত হই। এই সামাজিক বয়কট কী ভয়াবহ এবং নির্মম হতে পারে, তা আমরা বুঝতে পারি যখন এই ধরনের ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন ঘটনা সবসময় নতুন নয়। হয়তো আমরা শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে এমন অনেক ঘটনাকে অবহেলা করি, কিন্তু গ্রামীণ জীবনে এই ধরনের সামাজিক বয়কটের প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে। গ্রামের মানুষদের জন্য কূপের পানি, স্থানীয় দোকান থেকে বেচাকেনা, শিশুদের স্কুলে যাওয়া এই সবকিছুই তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন এই সুযোগগুলো থেকে কাউকে বঞ্চিত করা হয়, তখন সেটি কেবল একটি ব্যক্তির নয়, পুরো পরিবারের জীবনকেই স্তব্ধ করে দেয়।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন একটি ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম যখন আমার গ্রামের এক ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একটি ছোটখাট অপরাধের জন্য সমাজের কাছে জবাবদিহি করতে পারে নি। তার ওপর সামাজিকভাবে বয়কট আরোপ করা হয়। দোকানে তার বেচাকেনা বন্ধ করে দেয়া হয়, গ্রামের কূপের পানি তাকে ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি এবং তার সন্তানদেরকে স্কুলে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। আমি তখন খুব ছোট ছিলাম কিন্তু এই ঘটনাটি আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল। আমার মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগতো, কেন একজনকে সামাজিকভাবে এত বঞ্চিত করা হচ্ছে? তার অপরাধ কী ছিল যে তার জীবন পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেয়া হলো?

এই ধরনের ঘটনা কেবল সেই ব্যক্তির বা তার পরিবারের জন্যই নয়, পুরো সমাজের জন্যও একটি অন্ধকার দিক প্রকাশ করে। এটির ফলে আমরা দেখতে পাই কতটা সহজে একটি সমাজের অংশ হতে পারি এবং কতটা দ্রুত সেই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারি। একজন ব্যক্তিকে যখন সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়, তখন সে কেবল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তার মানসিক অবস্থাও বিপর্যস্ত হয়। তার আত্মবিশ্বাস হ্রাস পায়, এবং তার সমাজের প্রতি বিশ্বাস হারায়। এমনকি তার পরবর্তী প্রজন্মের মাঝেও এই আঘাতের প্রভাব পড়ে।

এই ঘটনায় সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, যারা সামাজিক বয়কট আরোপ করে, তারা নিজেরাই সমাজের নিয়মের বিরুদ্ধে যায়। কারণ সামাজিক বয়কটের মাধ্যমে তারা একটি ন্যায় বিচারের পরিবর্তে প্রতিহিংসার সংস্কৃতি গড়ে তোলে। আমি মনে করি, এই ধরনের ব্যবস্থা গ্রামে এখনো প্রচলিত আছে কারণ আমাদের আইন ও বিচার ব্যবস্থা সেখানে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। অনেক সময় স্থানীয় পঞ্চায়েত বা ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা নিজেদের ইচ্ছামতো বিচার করে থাকে, যা সম্পূর্ণ অমানবিক এবং অন্যায়।

আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, একজন ব্যক্তি এবং তার পরিবারের প্রতি এমন নির্যাতন কেবল তাদের জীবনকেই কষ্টে ফেলে দেয় না, বরং আমাদের সমাজের মূল্যবোধকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমাদের সমাজে ন্যায় বিচারের একান্ত প্রয়োজন এবং যেকোনো সামাজিক বয়কটের বিরুদ্ধে সকলকে সোচ্চার হওয়া উচিত।

আমি ভাবি, আমরা কবে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলব যেখানে প্রত্যেকে নিরাপদে এবং সম্মানের সাথে জীবনযাপন করতে পারবে? আমাদের উচিত স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে মিলে এমন ব্যবস্থার বিরোধিতা করা এবং সমাজে সঠিক ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করা। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো এমন পরিস্থিতি এড়াতে সচেতন থাকা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। আমরা কি এমন সমাজ চাই যেখানে কাউকে সামাজিকভাবে বয়কট করে তার জীবনকে দুঃসহ করে তোলা হয়? না কি আমরা এমন একট সমাজ চাই যেখানে প্রত্যেকের মতামত ও অবস্থানের মূল্যায়ন হয়?

শেষ কথা হলো, আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেদের অবস্থান থেকে সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করা এবং এ ধরনের সামাজিক বয়কটের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো। এখন সময় এসেছে এই নিষ্ঠুরতা ও অবিচারকে প্রতিহত করার। আমরা কি সেই সাহস দেখাতে পারব?

By laboni