বসন্তের এক সকালে যখন চারপাশের প্রকৃতি নবজীবনে জেগে ওঠে, তখনও আমাদের দেশের কিছু যুবক নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। এরা সবাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের, যারা জাতিগত বা ধর্মীয় বৈষম্যের কারণে নিজ দেশে নিরাপদ জীবন যাপন করতে পারছে না। ইউরোপে আশ্রয় পাবার আশায় তারা ছুটছে ঝুঁকিপূর্ণ পথে, যেখানে নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা হয়ে যাচ্ছিলো তাদের ট্রানজিট পয়েন্ট। এই পথের যাত্রা সহজ নয়, বরং প্রতিটি ধাপেই থাকে জীবনের ঝুঁকি।
আমাদের অনেকেই ভাবি, কেন তারা এত ঝুঁকি নিচ্ছে? বসে দেশে থাকতে পারে না? কিন্তু যারা এর মধ্য দিয়ে গেছে বা যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তারা জানে যে নিরাপত্তার অভাব, বৈষম্য এবং সামাজিক নিপীড়ন এমন পর্যায়ে চলে গেছে যেখানে আর অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তরুণদের মধ্যে অনেকেই বলেন, ‘দিন দিন আমাদের জীবনের মান কমে যাচ্ছে, সমাজে আমাদের কোনো গুরুত্ব নেই।’ এমন অবস্থায় তারা একটি নতুন জীবন খুঁজতে পাড়ি জমায় ইউরোপে, যেখানে তারা মানবাধিকার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং আশা করে আরও উন্নত জীবন।
নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা কেনো তাদের গেটওয়ে? এর পেছনে কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে। নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা ভিসা পেতে তুলনামূলক সহজ এবং ভ্রমণ খরচ অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। এছাড়াও এই দেশগুলোতে অনেকেই তাদের কাগজপত্র ফিক্স করতে পারেন, যা ইউরোপ যাওয়ার জন্য প্রয়োজন হয়। যদিও এই ধরনের কাজে জড়িত হওয়া আইনত অপরাধ, তবে অনেকেই এই পথে পা বাড়ায় কারণ তারা আর অন্য কোন সুযোগ দেখছে না।
নেপালে যাওয়া যত সহজ, ততই কঠিন নিজের সুরক্ষায় থাকা। একবার সেখানে পৌঁছালে জানতে পারেন যে বিভিন্ন দালাল চক্র তাদের টার্গেট করছে। ‘তুমি যদি ইউরোপ যেতে চাও, তাহলে আমাদের এই পরিমাণ টাকা দিতে হবে।’ এটি একটি সাধারণ বক্তব্য যা তারা শোনে। সেখান থেকে আবার শ্রীলঙ্কা, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি।
শ্রীলঙ্কায় পৌঁছে তারা দেখে যে তাদের আশ্রয় এবং ভ্রমণের জন্য যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে তারা পড়ে যায় এক ভিন্ন দুনিয়ার মাঝে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে শঙ্কিত থাকতে হয়। ভ্রমণ বা আশ্রয় পেতে অনেকেই প্রতারিত হয়। অনেক যুবকরা শ্রীলঙ্কায় পৌঁছে কাজের খোঁজে থামে এবং তারপর ফেলে দেওয়া হয়, কারণ তাদের প্রতিশ্রুত থাকা কাজ বাস্তবে নেই।
এসব যাত্রার কাহিনী যখন আমরা শুনি বা সংবাদপত্রে পড়ি, তখন বুঝতে পারি যে এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর অসহায়ত্ব। এই ধরনের ঘটনা শুধু একদিনে ঘটে না, বরং দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চলতে থাকে। আমরা কি সত্যিই বুঝতে পারি তাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কি কারণ লুকিয়ে আছে? দিনের শেষে, আমরা কি তাদের এই ঝুঁকির পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারি না?
আমাদের দেশের সরকার কি করতে পারে? আমাদের সমাজের কাছে কি তাদের জন্য কোনো সমাধান আছে? যদি আমাদের সমাজ তাদের গ্রহণ করতে রাজি না হয়, তাহলে কি আমরা তাদের জন্য কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি না? এই প্রশ্নগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যতের সমাধান। আমরা কি পারি না একত্রে কাজ করে তাদের সুরক্ষিত করার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে?
কিন্তু কথা হলো, এই ধরনের উদ্যোগের জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ। শুধু সরকার নয়, আমাদেরও সচেতন হতে হবে এবং নিজেদের অবস্থান থেকে সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। এই ধরনের সমস্যা সমাধানে আমাদের মনোযোগ এবং সমর্থনই হতে পারে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের উত্তরণ। এমনকি সাংস্কৃতিক বিনিময়, শিক্ষার সুযোগ এবং সচেতনতা বাড়িয়ে আমরা সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারি।
আমরা কি সত্যিই পারি না তাদের জীবনের গুণগত মান উন্নত করতে? আমাদের সমাজ কি তাদের গ্রহণ করতে রাজি না? যদি আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি যেখানে সবাই সমান অধিকার এবং সুযোগ পায়, তাহলে হয়তো এই যুবকরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন হবে না, এবং তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাত্রা করতে হবে না।
শেষ পর্যন্ত, এই সমস্যা সমাধানে আমাদের সবার দায়িত্ব আছে। সেই যুবকদের নিরাপত্তা এবং উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে আমরা কি পারি না কিছু করতে? তাদের জন্য যদি একটি নিরাপত্তার আশ্বাস দিতে পারি, তবে হয়তো আগামীতে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার গল্প আর শোনা যাবে না। আমরা কি প্রস্তুত সেই পরিবর্তনের জন্য?
