বাঙালি আমরা। মাটির টান অনুভব করি দারুণভাবে। বিশেষ করে যখন দেশ ছাড়তে হয়, তখন সেই অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। জীবনের বড় সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়া অন্যতম, যা অনেক সময় আমাদের মনের গভীরে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। এই ক্ষত সবার দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমাদের তাড়িত করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি অনেকের জীবনেই বাস্তব হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে যখন জীবন-মরণের প্রশ্ন আসে।

শুরুতেই বলি, দেশের বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা অনেকের মনে থাকতেই পারে। ভালো চাকরি, উন্নত জীবনযাপন, সন্তানদের ভালো শিক্ষা এই সবই মানুষকে বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করে। কিন্তু যখন পরিস্থিতি এমন হয় যে দেশ ছেড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, তখন তা একেবারেই অন্য একটি মাত্রা পায়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কত রকম চ্যালেঞ্জ, আবেগ, দ্বন্দ্ব ও সাহসের গল্প লুকিয়ে থাকে, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন।

এখন যদি আমরা একটু গভীরভাবে চিন্তা করি কেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি আমাদের হতে হয়, তাহলে কিছু বাস্তব চিত্র দেখতে পাব। প্রথমত, দেশে অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্য এবং আঞ্চলিক বৈষম্য অনেক বড় একটি কারণ। ঢাকার বাইরে অনেক এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, যা মানুষের জীবনে স্থায়ীভাবে উন্নতি আনতে পারে না। ঢাকার মতো বড় শহরে যদিও সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি, তবুও প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে সবাই সেখানে টিকে থাকতে পারে না। অনেকেরই বাঁচার জন্য কোনো বিকল্প থাকে না, জীবিকার তাগিদে তারা দেশের বাইরে পাড়ি জমায়।

একটি বাস্তব চিত্র নিয়ে আসি। আমার এক বন্ধু, নাম রফিক। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেছে, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রের এমন দৈন্যদশা যে বছর পেরিয়ে গেলেও তার কাজের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব পেল, এবং একসময় বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত নিল যে প্রিয় বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে হবে। প্রথমে সব কিছু দারুণ লাগলেও কিছুদিনের মধ্যে সে বুঝতে পারল কতটা কঠিন এই জীবন। প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকা, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের দেশকে প্রতিনিয়ত মনে পড়া যেন মনের মধ্যে সারাক্ষণ একটি অস্থিরতা কাজ করে। এই অনুভূতি, এই দাগ, আজীবন মনে থেকে যায়।

আবার আমাদের নিজেদের একটি প্রেক্ষাপটও আছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাও অনেক সময় মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। কেউ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি জমায়, কেউ আবার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। আমাদের দেশের সুন্দরবন ক্রমাগত ছোট হয়ে আসছে, ফসলের মাঠে লবণাক্ত জল ঢুকে পড়েছে, নদী ভাঙ্গন মানুষের ঘরবাড়ি কেড়ে নিচ্ছে। এসব বাস্তবতার মুখোমুখি হলে দেশের প্রতি ভালোবাসা সত্ত্বেও অনেকেই নির্বাসনের পথ বেছে নেন।

একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, দেশের বাইরে গিয়ে উন্নত জীবনযাপন করা আমাদেরকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করতে পারে, কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের মূল্যবোধ এবং প্রিয়জনদের সাথে সেই সহজ যোগাযোগের অভাব পূরণ করা যায় না। একজন বাঙালি হিসেবে এই বিষয়টি আমাকে প্রতিনিয়ত ভাবায়। আমরা যখন বাইরে যাই, তখন সেই দেশটি আমাদেরকে আশ্রয় প্রদান করে ঠিকই, কিন্তু সেখানকার সমাজ কখনোই পুরোপুরি আপন হয়ে ওঠে না। এই মুহূর্তে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও, তাদের নিজেদের ভেতরে এতটাই শূন্যতা থাকে যা সত্যিই পূরণ করা যায় না।

তবে হ্যাঁ, একেবারে সবই নেতিবাচক নয়। অনেকেই বিদেশে গিয়ে সফল হয়েছেন, নিজের এবং পরিবারের জীবনে আশানুরূপ পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, এই সফলতার পেছনে যে দুঃখ, বেদনা এবং দেশের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ থাকে, তা কী করে মাপা যায়? দেশের বাইরে গিয়ে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া কি সত্যিই চূড়ান্ত সমাধান, নাকি এটা কেবল একটি সাময়িক পরিত্রাণ? আমাদের কি উচিত নয় দেশে থেকেই সেই পরিবর্তনের চেষ্টা করা, যা আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের সুযোগ এনে দেবে?

আমার মনে হয়, আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে প্রয়োজন এক নতুন ধরণের ভাবনা। বিদেশে গিয়ে উন্নতির চেষ্টা করাও যেমন একটি পথ, তেমনি দেশের ভেতরেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের উচিত সেই চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করা এবং নিজের দেশকে এমন একটি জায়গা হিসেবে গড়ে তোলা যেখানে কেউ বাধ্য হয়ে প্রিয় মাটি ছেড়ে যেতে না হয়। হয়তো এটাই হবে সেই হৃদয়ের দাগ মুছে ফেলার সঠিক পথ। তবে এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া আমাদের নিজেদের হাতে, এবং এভাবেই হয়তো আমরা আমাদের প্রজন্মকে একটি সঠিক দিশা দেখাতে পারব।

By sourav