প্রতিবছর নতুন বছর শুরু হলে আমাদের দেশে একটা নতুন প্রেরণা কাজ করে। স্কুলের নতুন ক্লাস, তরতাজা বইয়ের ঘ্রাণ, অফিসে নতুন পরিকল্পনা, সর্বোপরি জীবনে নতুন কিছু করতে চাওয়ার উদ্যম। কিন্তু এই নতুন বছরের শুরুতেই কিছু মানুষের মনে ভয় ঢুকে যায়। জানুয়ারির শুরুর দিকটায় আমাদের দেশে এক ধরনের অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা যেন প্রতিনিয়ত স্থায়ী হতে থাকে। যদিও এটা উৎসবের সময়, তবু কেন জানি আমাদের কিছু মানুষের কাছে এটা ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যারা এই ভয়ের শিকার, তারা মূলত আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িক সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। নতুন বছরের সময় বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালিত হয়, বিশেষ করে জানুয়ারি মাসে। শীতের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসের মতোই তাদের উপর ভয়টা প্রবাহিত হয়। তাদের মনে একটাই প্রশ্ন এই নববর্ষের আনন্দ কি তাদের জন্য নয়?
আমি এমন অনেক মানুষের কথা শুনেছি, যারা জানুয়ারি মাসের কথাই ভাবতে পারেন না শান্ত মনে। কেননা এই সময়টাতেই তাদের এলাকার কিছু উগ্রপন্থী লোক বিভিন্ন রকম উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। তারা ধর্মীয় উৎসবের ছলে বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ করে, যা তাদের ভীত বানিয়ে তোলে। কোনো এক বন্ধু বলছিলেন, “গত বছর জানুয়ারিতে আমাদের পাড়ায় একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল। এলাকার কিছু দুর্বৃত্ত মন্দিরে আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করেছিল। তখন থেকেই জানুয়ারি আসলেই আমার মনের অশান্তি বেড়ে যায়।”
একটা কথা মনে রাখতে হবে, কেউ যদি নিজের বাড়িতে নিরাপদ বোধ না করে, তাহলে তার জীবনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে যায়। আমরা যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমাদের অনেকেই এই বিষয়টা অনুভব করতে পারি না। কিন্তু যে মানুষজন প্রতিনিয়ত এই ভয়টা নিয়ে বাঁচেন, তাদের অনুভূতি অন্যরকম। তাদের কাছে জানুয়ারি মাসটা এক অমঙ্গলসূচক সময়ে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে কিছু মানুষের অজ্ঞতা এবং অসহিষ্ণুতা। তারা নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সবার উপর চাপিয়ে দিতে চান। এর ফলে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা নিজেদের অবাঞ্ছিত এবং নিরাপত্তাহীন মনে করেন। আমাদের উচিত এই বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন হওয়া। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাধারণ মানুষ সবার সহযোগিতায় এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের উচিত নিজের আশেপাশে যতটা সম্ভব শান্তি বজায় রাখা। যেকোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসনকে তথ্য প্রদান করা উচিত। আমাদের শিশুদেরও এ বিষয়ে সচেতন করা উচিত।
এটা ঠিক যে আমরা সবাই সমান অধিকার নিয়ে জন্মেছি। কিন্তু আমাদের কিছু মানুষের মনের গভীরে বাসা বাঁধা ভয় এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে দেয়। তবে এই ভয় অবসানের দায়িত্ব আমাদের। আমরা যদি একে অপরকে ভরসার হাত বাড়িয়ে দেই, তাহলে জানুয়ারির এই ভয়ের চক্র থেকে মুক্তি পেতে পারি।
একটি সমাজ তখনই সঠিকভাবে এগোতে পারে যখন তার সব সদস্য নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। জানুয়ারি মাসে যদি কেউ তার নিজের বাসায় নিরাপদ না বোধ করেন, তাহলে সেই সমাজের অগ্রগতির পথ কীভাবে মসৃণ হতে পারে? আমার মনে হয়, আমাদের উচিত এই ভাবনায় কিছুটা সময় দেয়া। আপনি কী মনে করেন? আমাদের কী করণীয় এই ভয় থেকে মুক্তি পেতে? আমি আপনাদের মতামত জানতে আগ্রহী।
