শিরোনামটা যখন প্রথম দেখলাম, তখন থেকেই মনে একটা ঝাঁকুনি লাগলো। এই ডিজিটাল যুগে ফেসবুক নামে যে প্ল্যাটফর্মটা আমাদের জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে, সেখানে একখানা পোস্ট দিয়েই যদি থানায় যেতে হয়, তবে আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোথায়? সমাজে আমরা কি তাহলে সত্যিই স্বাধীন নই? এই লেখাটি সেইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা।

বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহারে ধীরে ধীরে মানুষের অভ্যস্ততা বাড়ছে, সেখানে ফেসবুক পোস্টের পরিণতি হিসেবে থানায় যেতে হওয়া সত্যিই চমকপ্রদ এবং উদ্বেগজনক একটি বিষয়। বিশেষ করে সংখ্যালঘু যুবকেরা যখন এই প্রেক্ষাপটে সমস্যায় পড়ে, তখন বিষয়টি আরও জটিল হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের সমাজে ধর্মীয় অনুভূতি খুবই স্পর্শকাতর, যা কখনও কখনও আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করে ফেলে।

আমি নিজে ফেসবুকে বেশ সক্রিয়। প্রতিদিন নানা ধরনের পোস্ট দেখি, কখনও রাজনৈতিক, কখনও সামাজিক, কখনও ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ। কিন্তু সবকিছুতেই একটা দায়িত্ববোধ থাকে। ফেসবুকের মত মঞ্চে যখন কিছু প্রকাশ করি, তখন দায়িত্ববোধের সাথে প্রকাশ করি যেন কারো অনুভূতিতে আঘাত না লাগে। কিন্তু তরুণ সমাজ সবসময় এই ভারসাম্যের কথা ভাবতে পারে না। তারা অনেক সময় তাদের আবেগ বা মতামত দিয়ে পোস্ট করে ফেলে যা হয়তো সমাজের অন্যদের কাছে ভিন্নভাবে পৌঁছায়।

এই ঘটনাগুলো বিশেষ করে সংখ্যালঘু যুবকদের মধ্যে ঘটে যাদের পরিবারে কিংবা সমাজে নিজস্ব নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। তাদের ফেসবুক পোস্ট কখনও কখনও উস্কানিমূলক বা আক্রমণাত্মক বলে মনে করা হতে পারে। আর তখনই শুরু হয় ঝামেলা। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় যা তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। যেমন ধরুন, রাজু নামের একজন যুবক তার মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে হঠাৎই আইনের মুখোমুখি হয়। তার ফেসবুক পোস্টে ছিলো তার ধর্মীয় অনুভূতির একটি সরাসরি প্রচারণা, যা অন্য ধর্মের মানুষদের কাছে আপত্তিকর মনে হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি শুধুমাত্র একটি দায়িত্ব নয়, একটি অধিকারও? ফেসবুক পোস্ট দেয়ার আগে আমাদের কি বারবার ভাবতে হবে যে এটি কাউকে আঘাত করবে কিনা? আর যদি আসলেই আঘাত করার উদ্দেশ্য না থাকে, তবুও কেন এই ধরনের ঘটনা ঘটছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার জন্য আমাদের নিজেদের ভিতরে ঢুকে দেখতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, এবং সামাজিক কাঠামো কিভাবে কাজ করে তা বুঝতে হবে।

অনেকেই বলবেন, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে, কিন্তু তারও একটা সীমাবদ্ধতা আছে।’ হ্যাঁ, আমি একমত। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতাও কি আমরা নির্ধারণ করতে পারি? আমাদের সমাজে এই সীমাবদ্ধতা কি সবার জন্য সমান, নাকি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য তা আরও কঠোর? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের সমাজের গভীরে যেতে হবে।

একটি ঘটনা মনে পড়ছে, যখন একজন শিক্ষার্থী তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছিল। তার পোস্টে সে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে কিছু ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছিল। এই পোস্ট সমাজের একটি বড় অংশের অনুভূতিতে আঘাত করে, এবং সেই শিক্ষার্থীকে ব্যাখ্যা দিতে হয় থানায়। তার পোস্টে মনে হয়েছিল সে হয়তো তার বন্ধুমহলেই সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু ফেসবুকের গণ্ডি তো সবার জন্য উন্মুক্ত।

এই অবস্থায় কি করা উচিত? আমাদের কি চুপচাপ থেকে যাবো, নাকি নিজেদের মতামত প্রকাশ করবো? আমাদের সামাজিক পরিবেশ কি এমন যে সেখানে ভিন্নমত প্রকাশ করতে গেলেই বিপদে পড়তে হবে? এখানে আমাদের উচিত সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা, যাতে কেউ তার মতামত প্রকাশ করতে ভয় না পায়।

তবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে সাথে আমাদের নিজস্ব দায়িত্ববোধের ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যা প্রকাশ করি, তা যেন সমাজের কোনো অংশের অপমান না করে। একই সাথে আমাদের আইনকানুনেরও এমন হওয়া উচিত যাতে কেউ ভুলভাবে আক্রান্ত না হয়।

আমার মতে, ফেসবুক পোস্টের পরিণতি যদি থানায় যেতে হয় তবে তা আমাদের সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে সাথে সমাজের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সচেতন হতে হবে যাতে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি হঠাৎ করে সমস্যায় না পড়ে। আমাদের নিজেদেরও সচেতন হতে হবে, যেন আমরা আমাদের মতামত সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারি এবং সেই মতামত সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য হয়।

পরিশেষে আমি বলবো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের অধিকার, কিন্তু সেই অধিকার পালনের সময় আমাদের দায়িত্ববোধের কথা ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের বুদ্ধি, বিবেচনা এবং মানবিকতার আলোয় আমাদের মতামত প্রকাশ করা উচিত। আজকের সমাজে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে, যাতে আমরা আর যেনো কোনো সংখ্যালঘু যুবককে তার মতপ্রকাশের জন্য থানায় যেতে না দেখি। প্রশ্ন রয়ে গেলো, আমাদের সমাজ কি সত্যিই এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত? আমরা কি এমন একটা সমাজ গড়ে তুলতে পারবো যেখানে মতপ্রকাশের কারণে কেউ আর সমস্যায় না পড়ে?

By purnima