একটা সময় ছিলো যখন বৈশাখের আগমনে আমাদের বাঙালীর ঘরবাড়ি আনন্দে ভরে উঠতো। ১৩ এপ্রিল রাত থেকেই ঘরে ঘরে চলতো পান্তা-ইলিশের আয়োজন আর পরদিন ভোরে শুরু হতো বৈশাখী শোভাযাত্রা। ঢাক-ঢোলের তালে তালে ছোট-বড়, তরুণ-বৃদ্ধ সবার মন জুড়ে আনন্দের ঢেউ। আর এর ভেতর দিয়ে স্থান পেতো আমাদের সংস্কৃতির গৌরবময় বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু হায়! আজ সেই আনন্দময় উৎসবের মধ্যে ঢুকে পড়েছে এক অন্ধকার। পেছন থেকে কেউ কেউ চুপিসারে পাথর হাতে এসে সেই উৎসবকে ‘হারাম’ বানানোর চেষ্টা করছে।

আমার বয়স তখন বাইশ, যখন প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধু চত্বরে পা রাখি বৈশাখের শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার জন্য। ঢাক-ঢোলের তালে তালে যেভাবে সবার মন প্রাণ একাকার হয়ে মিলেমিশে গিয়েছিলো, সেটা ছিলো এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তখনও উৎসবের প্রাণের মধ্যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ভয় ছিলো না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেন এ অবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। এটি শুধু আমার একার অশান্তি নয়, বরং অনেকেরই।

গত কয়েক বছর ধরে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে কিছু দুঃখজনক ঘটনা আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কিছু মানুষ নিজেদের ধর্মীয় মতাদর্শের অবলম্বন করে এই উৎসবকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। একবার শোনা যায়, শোভাযাত্রায় আক্রমণ হয়েছে, কেউ পাথর ছুঁড়েছে। আবারো কারো মুখ থেকে শোনা যায়, এসব ‘হারাম’ এবং বিধর্মীয় প্রথা। সবার আগে বুঝতে হবে যে পহেলা বৈশাখের উৎসবের পেছনে কোনো ধর্মীয় প্রেক্ষাপট নেই, বরং এটি আমাদের বাংলা সংস্কৃতির অংশ। এটি ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালীর একতার প্রতীক।

বৈশাখ উদযাপনের এই আক্রমণগুলো কিন্তু হঠাৎ করে ঘটেনি। এদের পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের প্রচার। মাঝে-মধ্যে ফেসবুক এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে দেখা যায়, কিছু মানুষ নিজেদের ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচার করতে গিয়ে বৈশাখী উৎসবের বিরোধিতা করছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু দল এবং ব্যক্তির প্রচেষ্টা, যারা সমাজে বিভাজন তৈরি করতে চায়। তারা বোঝেন না যে এই উৎসবের মধ্যে দিয়ে আমারা আমাদের বাংলাদেশী এবং বাঙালী পরিচয়কে আলিঙ্গন করি।

কিছুদিন আগে আমার এক পরিচিত জনের কাছ থেকে একটি মজার ঘটনা শুনলাম। তার ছোট ভাই আবীর, যে এখন মাত্র কলেজে উঠেছে, পহেলা বৈশাখে তার বন্ধুদের সাথে শোভাযাত্রায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলো। কিন্তু তার এক বন্ধু হঠাৎ করে এসে বললো, “আমি যাব না। পহেলা বৈশাখ তো হারাম!” এই কথাটি শুনে আবীর যথেষ্ট অবাক হয়েছিলো। সে নিজের উৎসাহে বৈশাখ উদযাপন করতে গিয়েছিলো, অথচ তার বন্ধু ধর্মের অজুহাতে তাকে নিরুৎসাহিত করলো।

এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই বিভ্রান্তি? এর পেছনে কি আমাদের শিক্ষার কোনো ঘাটতি রয়েছে? নাকি এটি আমাদের সমাজের কিছু শ্রেণীর পরিকল্পিত প্রচেষ্টা? আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, সবাইকে এই উৎসবের প্রকৃত অর্থ বোঝানো। এটি আমাদের সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা এবং ঐতিহ্যের সমাহার। বৈশাখী উৎসবের মাধ্যমে আমরা আমাদের শিকড়ের সন্ধান পাই। এটি কেবল একটি দিন নয়, বরং আমাদের সংস্কৃতির একটি উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।

আমার মতে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এই বৈশাখী উৎসবের গুরুত্ব এবং এর প্রকৃত অর্থ সঠিকভাবে তুলে ধরা উচিত। স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে যদি আমাদের সংস্কৃতির এই দিকটি আরও গুরুত্বসহকারে রাখা যায়, তবে হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে এই বিভ্রান্তি আর থাকবে না।

এছাড়াও, মিডিয়ার ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিডিয়া যদি বৈশাখী উৎসবের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে এবং এর পেছনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে, তবে সমাজে পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমাদের মিডিয়ার মাধ্যমে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা উচিত, যেন সব শ্রেণীর মানুষ এই উৎসবের গুরুত্ব বুঝতে পারে।

তবে এটাও সত্যি যে, মিডিয়া যদি যত্নশীল না হয়, তবে উল্টো প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু মিডিয়া নিজেরাই বিতর্কিত বিষয় তুলে ধরে বিভাজন তৈরি করতে পারে। আমাদের সকলের উচিত এমন মিডিয়া কনটেন্টের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে সংস্কৃতির গুরুত্ব বোঝানো।

আমাদের সবার উচিত এই উৎসবের প্রতি শুভ দৃষ্টি রেখে সমাজে ঐক্য বজায় রাখা। পহেলা বৈশাখ কেবল একটি দিন নয়, বরং এটি একটি অনুভূতি, যা আমাদের সকলকে একত্র করে। আমরা যদি এই অনুভূতিকে রক্ষা করতে পারি, তবে কোনো পাথরই আমাদের একতা ভাঙতে পারবে না। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত? কর্মকর্তা, ছাত্র, শিক্ষক, মিডিয়া সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই এই অন্ধকার ছাপিয়ে আলো ফিরিয়ে আনতে পারে। আমরা কি সেই নিজস্বতাকে রক্ষা করতে চাই না, যা আমাদের পরিচয় দেয়?

By rimjhim