আদিবাসী ও পাহাড়ি খ্রিস্টানদের জমি সংকট: উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ
আসলে আমরা যখন উন্নয়নের কথা বলি, তখন একটু ভেবে দেখতে হবে, কার উন্নয়ন? কেন এই উন্নয়ন? আর কারা এই উন্নয়নের সুবিধাভোগী? বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকা যদি লক্ষ্য করি, সেখানকার আদিবাসী ও পাহাড়ি খ্রিস্টানরা বহুদিন ধরেই জমি সংকটে ভুগছে। এই সংকট নতুন কিছু নয়, তবে দিন দিন এটা যেন আরও জটিল হয়ে উঠছে। আমি নিজেও যখন বান্দরবানে কয়েকবার ঘুরতে গিয়েছি, তখন এই বিষয়গুলো সামনে এসেছিল। পাহাড়ি এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পের ধাক্কায় অনেক মানুষ তাদের পৈতৃক জমি হারাচ্ছে, যা তাদের জীবিকা এবং সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু।
বেশ কিছু বছর ধরে শুনে আসছি, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে, আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। যদিও উন্নয়ন হওয়া খুবই দরকারি একটা বিষয়, কিন্তু সেটা কি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিনাশ ঘটিয়ে হতে হবে? উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ আদতে উন্নয়নের খরচ বহন করছে কি? পাহাড়ি এলাকার মানুষদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, তাদের জমি কেবলমাত্র তাদের জীবিকার উৎস নয়, বরং তাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রতীক। তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক, সবকিছুই যেন মাটি ও পরিবেশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
একবার রাঙামাটিতে গিয়েছিলাম বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে। সেখানে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে একটা চাপা আতঙ্ক আর হতাশা দেখেছি। তারা জানায়, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য তারা নিজস্ব জমি থেকে বিতাড়িত হচ্ছেন, যাতে তারা কখনোই ফিরে আসতে পারবেন না। অনেকেরই জমির মালিকানা স্বীকৃত নয়, কারণ সেই জমির কোনো কাগজপত্র তাদের কাছে নেই। পরিবার থেকেই জমির উত্তরাধিকার হয়েছে, কিন্তু সরকারি নথিতে সেটা স্বীকৃত নয়। আপনি যদি চিন্তা করেন, কোনো দিন হঠাৎ করে আপনার বাড়ি, আপনার জমি, আপনার শিকড় ছিন্ন করে আপনাকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়, তাহলে আপনার কেমন লাগবে? এর মানে কি এই যে, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, জীবিকা সবকিছুই ত্যাগ করা যাবে?
এই পরিস্থিতি অবশ্যই সবার জন্য স্বস্তির নয়। তবে আদিবাসী ও পাহাড়ি খ্রিস্টানদের জন্য তা যেন আরও বেশি সংকটময়। তাদের জমি তাদের সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে কাজ করে। একইসঙ্গে, এই জমি তাদের জীবিকাও সরবরাহ করে। এই জমি ছাড়া তারা কোথায় যাবেন? তাদের নিজস্ব শিকড় ছাড়া তাদের অস্তিত্ব পূর্ণতা পায় কীভাবে? এটা অনেক বড় প্রশ্ন। সমস্যার সমাধান কি আমরা উন্নয়নের নামে এই সব মানুষদের উচ্ছেদ করেই করতে পারি?
আমি মনে করি, উন্নয়ন অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু সেটা মানবিক উন্নয়ন হতে হবে। এমন উন্নয়ন যার ফলে আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়। বাংলাদেশের সংবিধানও কিন্তু সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আদিবাসী ও পাহাড়ি খ্রিস্টানদের জমি সংকট সমাধানে রাষ্ট্রকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের জমির অধিকার স্বীকৃত করে, তাদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা যখন উন্নয়ন বলি, তখন সেটা যেন দেশের সকল জনগণের জন্য হয়। উন্নয়ন যেন কিছু সংখ্যক মানুষের জন্য না হয়। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেন সুলভভাবে দৃশ্যমান হয়, যা সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং নিরাপত্তা প্রদান করে। আমার মনে হয়, এটা সময় এসেছে যখন আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত, আমরা কোন উন্নয়নের পথে যাচ্ছি? আমাদের উন্নয়নের পথ কি মানবিক? আদিবাসী ও পাহাড়ি খ্রিস্টানদের জমি সংকটের মতো সমস্যাগুলো কি আমরা সমাধান করতে পারব? এই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের ভবিষ্যতের উন্নয়নের পথ নির্ধারণ করবে।
তাই, আমার মতামত হলো, উন্নয়ন হতে হবে এমন যাতে আমাদের দেশের প্রতিটি জনগণ তার সুফল পায় এবং তাদের সংস্কৃতি এবং জীবনধারণের পদ্ধতি বিঘ্নিত না হয়। যদি আমাদের উন্নয়নের পথে কারো ক্ষতি হয়, তাহলে সেই উন্নয়নকে পুনর্বিবেচনা করা উচিত। উন্নয়ন মানে তো শুধু বড় বড় দালান-কোঠা তৈরি নয়, বরং প্রতিটি মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনমান উন্নত করা। তাই, আমাদের সবার উচিত এই সমস্যা সমাধানে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আমাদের সমাজ, আমাদের দেশের উন্নয়ন এমনভাবে হওয়া উচিত, যা কাউকে পেছনে ফেলে নয়, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
