এই সমস্যাটা বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের একটি চিরাচরিত রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রায়ই আমরা দেখি যে সংবাদমাধ্যমে সংঘর্ষের খবর প্রচারিত হয় কিন্তু সেই সংঘর্ষে আহত বা নিহতদের সুনির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করা হয় না। এতে কি আমরা প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাচ্ছি, নাকি সবকিছু একটা রহস্য তৈরি করেই শেষ হচ্ছে?
যখন কোনো ঘটনার সংবাদ প্রচার করা হয়, তখন সংবাদমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণকে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করা। কিন্তু বাস্তবে, প্রায়ই দেখা যায় যে প্রতিবেদনে সংঘর্ষের পেছনের সঠিক কারণ, প্রতিপক্ষের পরিচয়, এমনকি আহত বা নিহতদের নামও উল্লেখ করা হয় না। শুধু বলা হয় ‘দুই পক্ষের সংঘর্ষ’, যেন এটাই যথেষ্ট।
এখন প্রশ্ন হলো, কাদের স্বার্থে এই ‘দুই পক্ষ’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়? অধিকাংশ সময়ই এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে, যা সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করে। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে যদি সংঘর্ষ ঘটে, সেই সংঘর্ষের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কোন ভূমিকা ছিল কি না, সেসব তথ্য কি আমরা জানি? অনেক সময়ই সেই তথ্যগুলো চাপা পড়ে যায়।
বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। এমনকি কখনও কখনও সামান্য বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থকদের মধ্যে বিবাদ লেগে যায়। এই ধরনের ঘটনায় আহতদের নাম প্রকাশ না করে, আমরা কি প্রকৃত সমস্যা সমাধানের পথে হাঁটতে পারি? না, বরং সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে ওঠে। সাধারণ জনগণের আস্থা হারায় সংবাদমাধ্যমের ওপর থেকে, কারণ তারা দেখতে পায় যে সংবাদে সব সময়ই কিছু না কিছু চাপা থেকে যায়।
সংবাদমাধ্যমের এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকে আমরা কি ভাবে গ্রহণ করি? অনেকেই ভাবেন যে, সংবাদমাধ্যম হয়তো নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন মনোভাব, যা সংবাদ জগতে আরো বিশাল সমস্যা তৈরি করে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলি, এমন অনেক ঘটনা দেখেছি যেখানে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের কথা কখনই মিডিয়ায় আসে না। তারা যেন অদৃশ্য থেকে যায় সেই রিপোর্টের আড়ালে। যখন আমরা এই ধরনের ঘটনা সম্বন্ধে জানতে পারি, তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, কেন তাদের নাম প্রকাশ করা হলো না? তারা কি আসলেই অপ্রকাশিত থাকার যোগ্য? নাকি তাদের নাম প্রকাশ করলে কিছু গোপন সত্য প্রকাশ পেয়ে যাবে?
এই সমস্যার সমাধান হতে পারে সংবাদমাধ্যমের আরো বেশি তদন্তমূলক রিপোর্টিং। শুধু ঘটনাটি ঘটে গেছে বলে সংবাদ প্রকাশ করা যথেষ্ট নয়, বরং সেই ঘটনার পেছনের প্রকৃত সত্য খুঁজে বের করে তা জনগণের সামনে তুলে ধরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সাংবাদিক বন্ধুরা এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে এবং তাদের প্রতিবেদনে সত্যতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা সাধারণ জনগণ কিভাবে এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারি? আমাদের উচিত হবে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সংবাদমাধ্যমকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহিতা করতে বাধ্য করা। যখনই আমরা এমন কোনও রিপোর্ট দেখব যা অপূর্ণ বা পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয়, তখনই আমরা আমাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরব। সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা শুরু করব, প্রতিবাদ জানাব।
আমার বিশ্বাস, আমরা যদি আমাদের অবস্থান শক্ত করে ধরি এবং মিডিয়ার কাছে সঠিক তথ্য প্রকাশের দাবি জানাই, তবে একদিন অবশ্যই পরিবর্তন আসবে। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সংবাদ জগতে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হতে পারে। অন্যথায়, আমরা সব সময়ই সেই ‘দুই পক্ষের সংঘর্ষ’ কথায় আটকে থাকব, আর কখনোই জানতে পারব না সেই সংঘর্ষের আসল কাহিনী।
তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, মিডিয়া কি আদৌ আমাদের প্রকৃত সত্য জানাবে? নাকি আমরা সব সময়ই অর্ধেক সত্য জেনে সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে।
