আচ্ছা, কখনো কি ভেবেছেন, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন ও হামলার খবর কেন শিরোনামে থাকে? এই বিষয়টি নিয়ে একটু বিশদে আলোচনা করা যাক। “এক বছরে কতজন নিহত, কত মন্দিরে হামলা: সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর নিজস্ব হিসাব” – এই শিরোনামটা শুনেই মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করে। আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা কি সঠিকভাবে রক্ষা হচ্ছে? অথবা তারা কি ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের সবাইকে ভাবিয়ে তোলে।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টানদের কথা। শতকরা হিসেবে আমাদের জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ হলেও তাদের অবদান কিন্তু কম নয়। এক সময় আমাদের দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যাটা অনেক বেশি ছিল, কিন্তু ক্রমাগত নির্যাতন ও দুর্যোগের শিকার হয়ে তাদের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এটা একধরনের দুঃখজনক সত্যি, যা আমরা জেনেও উপেক্ষা করি।
সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর নিজস্ব হিসাব বলছে, ২০২২ সালে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে যেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রাণ হারাতে হয়েছে। এছাড়াও মন্দিরে হামলার ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি। এ ধরনের সহিংসতার ঘটনাগুলো হয়তো সংবাদ মাধ্যমের শিরোনামে আসে না, কিন্তু তা সংখ্যালঘুদের মনে ভয় তৈরী করে দেয়। একটা সময় মনে হয়, আমরা কি সত্যিই সেই সমাজে বাস করছি যেখানে সকলের সমান অধিকার রয়েছে?
যখনই এমন কোনো ঘটনার কথা শুনি, মনটা ভীষণ খারাপ হয়। আমার মনে পড়ে সেই ছোটবেলার কথা, যখন পাড়ার মন্দিরে গিয়ে পূজা দেখতাম। কত সুন্দর একটা পরিবেশ ছিল, হিন্দু-মুসলিম মিলে একসাথে সব আয়োজন করতাম। কিন্তু এখন সেই পরিবেশটা কোথায়? এখন তো শুধু ভয় আর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাতে হয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই ধরনের হামলার ঘটনার পরও আমরা একটু সময় নিয়ে ভাবি না, কেন এসব হচ্ছে? এই সাম্প্রদায়িকতা আমাদের দেশকে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে? আমরা কি সত্যিই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটা সমাজ রেখে যেতে চাই, যেখানে কেউ নিরাপদ নয়, যেখানে কেউ পরমত সহিষ্ণু নয়? আমার মনে হয়, সময় এসেছে আমাদের নিজেদেরকেই প্রশ্ন করার। আমরা কি সত্যিই আমাদের দায়িত্ব পালন করছি?
দেশের সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো নিজেদের মতো করে পরিসংখ্যান রাখছে, আর সেই পরিসংখ্যান আমাদের জন্য একটা উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। হামলার ঘটনা তো ঘটে, কিন্তু তার বিচার হয় কতটা? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে গেলে আমাদের একটু গভীরে তাকাতে হবে। আমরা কি শুধু শিরোনাম দেখে ক্ষান্ত হব, নাকি এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য কিছু করব?
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমার মনে হয় আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখাটা খুবই জরুরি। আমরা যদি এখনই এ বিষয়টাকে গুরুত্ব না দেই, তাহলে ভবিষ্যতে এর পরিণতি খুব একটা ভালো হবে না। ইতিহাস গড়ার দায়িত্ব তো আমাদেরই। এখন আমাদের হাতে সেই সুযোগ আছে যে আমরা একটা সুন্দর সমাজ তৈরী করতে পারি।
তাহলে আসুন, আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করার। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হই এবং তাদের প্রতি সহমর্মিতা ও সহানুভূতি প্রকাশ করি। আমরা যদি আমাদের মন থেকে এই পরিবর্তন শুরু করি, তাহলে হয়তো একদিন আমরা সেই সমাজ দেখব, যেটা আমরা সত্যিই গর্বের সাথে আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য রেখে যেতে পারব।
আমাদের দেশের সার্বিক উন্নতি তখনই সম্ভব যখন সকল সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তা ও সমান অধিকারানুভব করবে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য আমাদের কী করা উচিত? আমরা কি শুধু বসে বসে তা দেখতে থাকব, নাকি এই পরিবর্তনের অংশ হব? সিদ্ধান্তটা আপনার হাতেই।
