মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখলেই এখন রাস্তাঘাটের একটা সাধারণ দৃশ্য দেখা যায় লোকজনের ভিড়, উত্তেজনায় ভরা কণ্ঠস্বর, হয়তো বা এককোণে কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে আর মোবাইলে রেকর্ড করে রাখছে সেই মুহূর্তগুলো। এ যেন এক তাজা থিয়েটার, সময়ভেদে যার প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠে সড়কপথে দাড়ানো কোনো দুর্ভাগা যুবক বা বয়স্ক। মোবাইল ফোনের দুনিয়ায় আমরা বাস করছি এমন এক যুগে, যেখানে একটি ভাইরাল ভিডিও মানেই তাৎক্ষণিক দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং সামাজিক মাধ্যমের পাতা জুড়ে তোলপাড়।

এই ধারাটির এক ভয়ানক রূপ হলো মব-ভায়োলেন্স, যেখানে কোনো ব্যক্তিগত বা ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সত্যি বলতে কি, একবার এই ভিড়ের মধ্যে আপনি ঢুকে গেলে, নিজেদের মধ্যে কেউ আর নিরপেক্ষ থাকে না। সবাই তার নিজস্ব ন্যায়বিচারের গল্পের অংশ হয়ে ওঠে। যেন সবই ঠিকঠাক চলছে এবং যাকে দোষী মনে হয় তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এদের উত্তেজনা কোন মাত্রায় পৌঁছায় তা দেখলে কল্পনার বাইরে মনে হয়। কিন্তু এই উত্তেজনার মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক ভয়ংকর পরিণতি ক্রসফায়ার।

বাংলাদেশে ক্রসফায়ারের ঘটনা নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রাদুর্ভাব যেন নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনেক সময়ই শোনা যায়, কোনো ঘটনা নিয়ে উত্তেজিত জনতা কাউকে ধরে, এবং তার পরিণতি হয় পুলিশের হাতে ক্রসফায়ার। অনেকে বলেন, এটি এক ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যা, যেখানে আইন নিজেই বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। যদি মোব-ভায়োলেন্স এবং ক্রসফায়ারের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে যান, তাহলে দেখতে পাবেন সামাজিক মূল্যবোধের এক ভয়ংকর চিত্র।

এই ঘটনার একটা বড় কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অস্থায়ী ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি। আজকাল কেউ কোনো বিষয়ে বিচার পাওয়ার আগেই নিজের বিচার নিজের হাতে তুলে নেয়। অথচ আমরা যদি ইতিহাসের দিকে একটু দৃষ্টি দেই, তাহলে দেখতে পাবো, আমাদের সংস্কৃতিতে ন্যায়বিচারের জন্য বিচার ব্যবস্থা একটা গুরুত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এখন এই বিচার ব্যবস্থা অনেক সময়ই চাপের মুখে পড়ে, এবং আমাদের সমাজে অবিচারের একটি প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে।

একটা সময় ছিল যখন মানুষ প্রকৃত বিচার পাওয়ার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতো। কিন্তু এখন যেন আমরা সে পরম্পরা ভুলেই গেছি। একটি ভিডিও ভাইরাল হলেই যেন তা সত্য, এবং সেই সত্যের বিচারের জন্য ক্ষুধার্ত জনতা স্ব-প্রণোদিত হয়ে ওঠে। অথচ এই ঘটনা যে কতটা ভীতি উদ্রেক করেছে তা কল্পনা করা মুশকিল নয়। এমনকি সেই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করার আগেই একজনের জীবন নিয়ে টানা হেঁচড়া শুরু হয়ে যায়। আর তখনই আরেকটি ভয়ংকর বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়, যা হলো ‘এনকাউন্টার’ বা ক্রসফায়ার।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, কে দায়ী এ পরিস্থিতির জন্য? প্রযুক্তি? না কি মানুষ নিজেই? আমাদের মানসিকতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এর জন্য কতটুকু দায়ী? তবে, যা-ই বলি না কেন, একথা স্বীকার করতে হবে যে, প্রযুক্তির সাহায্যে সহজলভ্য ভিডিও ক্লিপ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অতি সহজেই ভাইরাল হয়ে ওঠা কন্টেন্ট আমাদের সমাজের একটা বড় অংশকে প্রভাবিত করছে। ভালো দিক যেমন আছে, তেমনই রয়ে গেছে এর ভয়াবহ দিক।

আমি নিজেও এর সাক্ষী। কয়েক বছর আগে ঢাকার এক রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে দেখি ভিড় জমেছে। যখন কাছে গিয়ে দেখি, তখনই বুঝতে পারি, একজন যুবককে চোর সন্দেহে জনতা ঘিরে ফেলেছে। তার হাতে বাঁধা দড়ি আর মুখে রক্তের দাগ। কেউ তার পিঠে লাঠির আঘাত করছে, আবার কেউ তার মুখে থাপ্পড় দিচ্ছে। এমন একটা ভয়ংকর দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজের অসহায়ত্ব টের পেলাম। একটি মোবাইল হাতে নিয়ে ভিডিও করছি মনে পড়তে লাগলো, এটা ঠিক কি না। কি করবো, বুঝতে না পেরে সরে এলাম। কিছুক্ষণ পর শুনলাম, সেই যুবক ক্রসফায়ারে মারা গেছে।

আমাদের সমাজের এ ধরনের ঘটনা যেন ক্রমশ নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে। তবে এটাই কি আমাদের ভবিষ্যত? যেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যা, মব-ভায়োলেন্স, ভিডিও ভাইরাল হয়ে আমাদের বিচার ব্যবস্থার প্রতিস্থাপন করবে? এর উত্তর জানতে হলে আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, আইনব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির ব্যবহারকে নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। আমাদের সমাজ কী সত্যিই এই দুঃস্বপ্নের স্বাভাবিকতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেবে, নাকি আমরা এ থেকে মুক্তির পথ খুঁজবো? প্রশ্নটা আমাদের সবার।