উৎসবের নামে টার্গেটিং: বারবার একই স্ক্রিপ্ট, নতুন নতুন এলাকা
বাংলাদেশের ভূখণ্ডে উৎসবের জোয়ার সবসময়ই প্রবাহিত। বাঙালি জাতির রক্তে যেন উৎসবের স্রোত বয়ে চলেছে প্রাচীনকাল থেকে। বৈশাখী নতুন বছর হোক, খ্রিস্টীয় নববর্ষ, ঈদ, পূজা কিংবা পহেলা ফাল্গুন সব উৎসবেই আমরা জেগে উঠি, প্রাণের স্পন্দনে আন্দোলিত হই। কিন্তু উৎসবের এই আবহে যখন দেখি কোনো বিশেষ লক্ষ্যবস্তুতে টার্গেটিং করা হয়, তখন মনে হয় কোনটা আসল উৎসব আর কোনটা এক নতুন ধরনের প্যাকেজড উৎসব।
বছরের পর বছর ধরে, একই স্ক্রিপ্ট আমাদের চোখের সামনে খেলা করে। কখনও দোকানের আশাপাশে ঝলমলে আলো, কখনও নানান অফারের বিজ্ঞাপন, কখনও আবার সামাজিক মাধ্যমে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। এই সবকিছুই কিন্তু যেন এক অদৃশ্য শক্তির হাত ধরে পরিচালিত হয়, যা আমাদের মন মগজে প্রভাব ফেলে। তবে কী আমরা সত্যিই এই নতুন ধরনের টার্গেটিং বুঝতে পারি?
যখনই কোনো উৎসব আসে, তখন আমাদের চারপাশে শুরু হয় কেনাকাটার ধুম। বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে থাকে, সেগুলো যেন উৎসবের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে এই পণ্যগুলো না কিনলে আমাদের উৎসব পূর্ণাংগ হবে না। এই ধরনের প্রচারণা আমাদের মনকে প্রভাবিত করে এবং আমরা নিজেদের অজান্তেই তাদের ফাঁদে পড়ে যাই।
আমার এক বন্ধু, যে ঢাকার একটি বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে, তার নিজের একটি অভিজ্ঞতা বলেছিল। সে জানায়, উৎসবের আগে তার ম্যানেজারের কাছ থেকে একটি ইমেইল পেল যার বিষয়ে লেখা ছিল ‘স্পেশাল সেল অফার’। ইমেইলের মধ্যে নানা ধরনের পণ্যের তালিকা ছিল যা কিনলে তাদের উৎসবের আনন্দ বাড়বে। কিন্তু আসলে এই ধরনের অফিসিয়াল চাপ কি আমাদের আনন্দ বৃদ্ধি করে নাকি আমাদের কৃত্রিমভাবে বাজারমুখী করে তোলে?
গ্রামাঞ্চলেও এই টার্গেটিং ভিন্ন রূপে বিদ্যমান। আগে যেখানে উৎসব মানে ছিল পারিবারিক মিলন, মাঠে মেলা, এখন সেখানে জড়িয়ে গেছে এক অন্যরকম ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা। মেলা মানেই এখন বড় বড় স্টলের দৌরাত্ম্য, যেখানে স্থানীয় কুটির শিল্পের চেয়ে ব্র্যান্ডের আধিপত্য বেশি। ফলে গ্রামের সেই আদি রূপ হারিয়ে যাচ্ছে।
পৃথিবীর অনেক দেশেই উৎসবের সময় বাজারের এই প্রভাব থাকলেও, বাংলাদেশে এর প্রভাব কিছুটা ভিন্ন। কারন আমাদের দেশের মানুষ উৎসবে প্রায়শই সর্বস্ব দান করে দিতে প্রস্তুত। এবং ব্যবসায়ীরা এই মনের ব্যাপারটিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করতে পিছপা হয় না। কিন্তু এতে কী আমাদের উৎসবের মূল সত্তা হারিয়ে যাচ্ছে না?
উৎসব মানে কি কেবল কেনাকাটা, গ্ল্যামারাস অনুষ্ঠান আর চোখ-ধাঁধানো প্রচারণা? নাকি এর কিছু গভীর তাৎপর্য রয়েছে যা আমরা ভুলে যাচ্ছি? আমি বলি, উৎসব সেই সময় যখন আমরা পরিবার, বন্ধু এবং সমাজের সাথে মিলে আমাদের সম্পর্কগুলোকে নতুন করে গড়ে নিই, তাদের সাথে সময় কাটাই, স্মৃতির কোষাগার ভরে তুলি।
এখন সময় এসেছে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা আমরা কি সত্যিই এই ধরনের টার্গেটিং চাই? আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, এবং সম্পর্কের মধ্যে নিহিত আনন্দকে কেন আমরা এই কৃত্রিম স্ক্রিপ্ট দিয়ে ঢেকে ফেলব? আমাদের উচিত, এই টার্গেটিংকে চ্যালেঞ্জ করা এবং উৎসবকে সত্যিকারের আনন্দের উৎস হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা।
উৎসবের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। উৎসব আমাদের শিকড়ের সাথে সংযুক্ত করে, আমাদের প্রজন্মের সাথে ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির যোগসূত্র স্থাপন করে। যদি আমরা সত্যিই এই উপলব্ধি করতে পারি এবং নিজেদের টার্গেটিং থেকে মুক্ত রাখতে পারি, তবে হয়তো আমরা আসল উৎসবের নান্দনিকতা এবং আনন্দ ফেরত পেতে পারি।
তাহলে আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি যে, এইস্ক্রিপ্টের ফাঁদ থেকে বের হয়ে নিজেদের শিকড়ে ফিরে যাব। উৎসবের সময়টা হবে সম্পর্কগুলোকে আরও সুদৃঢ় করার, প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটানোর, এবং নিজেদের মধ্যে খুঁজে পাওয়ার। কী বলো, তোমাদের কি মনে হয় এটা সম্ভব? নাকি আমরা কৃত্রিম আনন্দের এই জগতে হারিয়ে যেতে থাকব?
