আমাদের শৈশবের দুর্গাপূজা ছিলো মিষ্টি মধুর স্মৃতিতে ভরা, যেখানে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরা, বন্ধুদের সাথে প্রতিমা দর্শন, এবং শেষে পেটপুরে খাওয়া এই সবকিছু ছিলো উৎসবের আনন্দ। কিন্তু বর্তমানে, উৎসব-ঋতুর পরিবেশ যেনো কিছুটা ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে দুর্গাপূজার আগের সময়টা এমন কিছু ঘটনা নিয়ে এসেছে যা আমাদের সবাইকে ভাবনায় ফেলেছে। গুজব আর টার্গেটেড হামলা এই বিষয়গুলো যেনো পূজার আনন্দের সাথে মিশে গিয়ে এক অদ্ভুত বিবমিষা তৈরি করছে।

এখন আপনি হয়তো ভাবছেন, কিভাবে পুরানো সেই সোনালী দিনগুলোর সাথে আজকের এই সময়ের তুলনা করতে পারি? মনে হয় সমাজের মানুষগুলো যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে ফেলেছে, যেটা আমাদের ভেতরের শান্তি আর বিশ্বাসকে ক্রমশই কালো মেঘে ঢেকে দিচ্ছে। দুর্গাপূজার সময় গুজব ছড়ানো যেন এক ধরনের ‘নতুন ট্রেন্ড’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গুজবের মূল উদ্দেশ্য কী হতে পারে? হয়তো ধর্মীয় অসহনশীলতা উস্কে দেওয়া, হয়তো বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ তৈরি করা। এমনকি, কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ফায়দা লোটাও এই গুজবের পেছনে থাকা উক্ত কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হতে পারে।

গুজবের প্রভাব আমাদের সমাজে কতটা গভীর, সেটা আমরা সবাই কমবেশি সহ্য করেছি। একজন অপরিচিত ব্যক্তি হঠাৎ করে আপনার ধর্মীয় বিশ্বাসকে টার্গেট করে কিছু বললে, আপনার মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি জেগে ওঠে। এই অস্বস্তি কখনো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, আর তখনই ঘটে হিংসার ঘটনা। বলা যায়, এই গুজব আর হিংসার চক্রটা যেন একটা ‘লুপ’ তৈরি করেছে একবার শুরু হলে সেটা থামানো মুশকিল।

তবে গুজবের চক্র যখন শুরু হয়, তখন কীভাবে আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে পারি? এর প্রতিরোধ আমরা করবো কীভাবে? একটা প্রধান উপায় হলো তথ্যের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। অনেক সময় দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়া বা মুখের কথায় প্রচারিত কিছু তথ্য গুজব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো সেই তথ্য যাচাই করা। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করা।

আরেকটা ব্যাপার, আমাদের সমাজে ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সংহতির প্রয়োজনীয়তা। ধর্মীয় উৎসবগুলো আপন করে নেওয়া, ভিন্ন ধর্মের বন্ধুদের সাথে উৎসবে অংশগ্রহণ, এই সমস্ত কিছুই আমাদের মধ্যে একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। আমরা যদি নিজেদের মধ্যে বিশ্বাস আর সহমর্মিতা জাগিয়ে তুলতে পারি, তাহলে ওই গুজব আর হিংসার চক্রকে ভাঙা সম্ভব।

২০২৩-এর দুর্গাপূজার সময় ঘটে যাওয়া কিছু টার্গেটেড হামলার ঘটনা আমাদের এই ভাবনায় বাধ্য করেছে যে, আমাদের সমাজে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। কেন এই টার্গেটেড হামলা? কে বা কারা এর পেছনে কাজ করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটা ব্যাপার সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কিছু কুচক্রী মহল তাদের স্বার্থে এই ঘটনার নাটের গুরু। তারা জানে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করতে পারলেই তাদের কাজ সফল হবে।

আমরা সাধারণ মানুষ, আমাদের সাধ্যের মধ্যে কী করণীয়? প্রথমত, নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা। ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে আমরা যদি একত্রিত হয়ে এই ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি, তাহলে এই চক্রকে ভাঙা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সহযোগিতা করা। তারা যদি সঠিক তথ্য ও সহযোগিতা পায়, তাহলে এই ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

আমার ব্যক্তিগত মত হলো, পরিবর্তন যদি আনতেই হয়, সেটা শুরু হোক আমাদের নিজেদের থেকেই। আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলতে পারি যে তারা ধর্মীয় সহনশীলতার মূল্য বুঝতে শিখবে। তারা যেন এমনভাবে বড় হয় যে তারা এই ধরনের গুজব বা হিংসায় বিশ্বাস করতে শেখে না।

আজকের বাংলাদেশে দুর্গাপূজার মতো উৎসবগুলোতে গুজব আর হামলার ছায়া যদি না থাকত, তাহলে হয়তো সমাজের চিত্রটা আরেকটু সুন্দর হতে পারত। আমাদের দেশ যদি তার সব ধর্মীয় উৎসবকে এক্ষেত্রে উদারভাবে উদযাপন করতে পারত, তাহলে হয়তো আমরা সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ পেতাম। আমাদের উচিত হবে প্রশ্ন তোলা আমরা কি সত্যিই এমন এক সমাজে বেঁচে থাকতে চাই যেখানে গুজব আর হিংসার মাধ্যমে উৎসবের আনন্দে কালো ছায়া পড়ে? নাকি আমরা এমন একটা পরিবেশ গড়তে পারি যেখানে ধর্মীয় সহনশীলতা আর শান্তি একসাথে মিলে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আর আমাদের পুরনো আনন্দের দিনগুলো ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমাদের সবার।