আমাদের দেশের মিডিয়া কতটা শক্তিশালী আর কতটা জোরদার। কিন্তু, সত্যি বলতে গেলে, মিডিয়ার খবরে যা প্রতিফলিত হয় তা সবসময়ই বাস্তব চিত্রের অনুরূপ নয়। এই বিন্দু থেকেই আমার আজকের আলোচনা শুরু।

যখন আমরা বাংলাদেশের সোলার এনার্জির ব্যাপারে মিডিয়াতে পড়ি, তখন আমাদের চোখে সবচেয়ে বেশি যা ধরা পড়ে তা হলো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। হেডলাইনগুলোতে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকে: “বাংলাদেশে সোলার এনার্জির বিপ্লব”, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ”, অথবা “সোলার এনার্জির ব্যবহারে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে বাংলাদেশ।” এসব শুনতে খুবই দুর্দান্ত লাগে, তাই না? কিন্তু, বাস্তব জীবনে এই কাহিনী ঠিক কতটা সত্য?

বাংলাদেশের একটি গ্রামের কথা বলি। নামটা ধরুন চরপাড়া। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, এই গ্রামের মানুষদের জীবনে সোলার এনার্জির আগমন হয়েছে। এই গ্রামের মানুষদের জন্য এটি যেন এক নতুন দিনের সূচনা। বিদ্যুৎ ছিল না, এখন তাদের ছেলেমেয়েরা রাতে পড়তে বসতে পারে, টিভিতে খবর দেখতে পারে, এমনকি বাসায় ফ্রিজও চালাতে পারে। এসবই সম্ভব হলো সোলার হোম সিস্টেমের (SHS) মাধ্যমে।

কিন্তু, এবার একটু গভীরভাবে দেখুন। এই সোলার প্যানেলগুলো স্থাপন করতে তাদের কতটা ঝামেলা পোহাতে হয়েছে জানেন? প্রথমত, প্যানেল কেনার জন্য লোন নিতে হয়েছে, যেটা শোধ করতে তাদের দিনের পর দিন ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। এই প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় অনেক সময় প্যানেল কাজ করছে না। তখন তাদের ছুটতে হচ্ছে শহরের দিকে মেরামতের জন্য। এসব কষ্টের কথাগুলো মিডিয়াতে কতটুকু আসে?

মিডিয়ার উপর নির্ভর করে থাকলে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। মিডিয়া সাধারণত বড় বড় উদ্যোগ, প্রকল্পের সাফল্য এবং সরকারি মতামতের দিকে বেশি নজর দেয়। তাই, যখনই আমরা মিডিয়ার খবরে সোলার এনার্জির সাফল্যের গল্প দেখি, তখন ভাবা উচিত সেই সফলতার পেছনে কতটা কষ্ট, সময় আর অর্থ ব্যয় হয়েছে।

আরেকটি বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। সোলার এনার্জি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিক্ষার অভাব কতটা গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশে এখনও অনেক গ্রামীণ এলাকা আছে যেখানে মানুষ বিদ্যুৎ সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না, সোলার প্যানেল তো অনেক দূরের কথা। সোলার এনার্জির ব্যাপারে তাদের ভাবনায় থাকে এই প্রযুক্তি কতটা বিশ্বাসযোগ্য। অনেকের ধারণা, “এই তো, সূর্য ওঠার সময়ে একটু আলো দেয়, তারপর আর কাজ করে না!” যখন এসব ধারণা ভাঙতে শুরু করে, তখন তারা দেখতে পায় যে সোলার প্যানেল তাদের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার ২০২০ সালে ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’ চালু করেছে। এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবু, এই উদ্যোগের বাস্তব চিত্র কেমন? পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৩% এই উৎস থেকে আসে। কিন্তু, প্রশ্ন হলো ৩% মানেই কি সবার কাছে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পৌঁছানো যাচ্ছে? এটা নিঃসন্দেহে একটি দারুণ পদক্ষেপ, কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে সবার কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছানো আজও সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং জমির সীমাবদ্ধতা সোলার প্যানেল স্থাপনে একটি বড় বাধা। আমাদের শহুরে এলাকায় সোলার প্যানেল স্থাপন করা কতটা কার্যকরী? ছাদে প্যানেল বসালে তার ছায়া পড়ছে অন্য বাড়ির ছাদে। এ নিয়ে বিরোধ শুরু হলেই আমাদের মিডিয়া সেখানে পৌঁছে যায়। কিন্তু, এই বিরোধের সমাধান কীভাবে হবে, তা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়।

আমরা যদি সত্যিই সোলার এনার্জির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাই, তাহলে আমাদের প্রয়োজন আরো সচেতনতা এবং শিক্ষার প্রসার। মিডিয়ার উচিত শুধু সাফল্যের গল্পই না, বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরা এবং তার সমাধানের পথে আলোকপাত করা। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের নিজেদের ভাবনা ও উপলব্ধিকে প্রসারিত করা। সাফল্যের গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্ট আর সংগ্রামের কথা শুনে আমরা কি সঠিকভাবে ভাবছি?

মিডিয়া আর আমাদের বাস্তব জীবন কখনো পুরোপুরি একরকম না হলেও, আমাদের উচিত সেই ফাঁকগুলো চিহ্নিত করা এবং তা পূর্ণ করার পথ খুঁজে বের করা। হয়তো একদিন এই ফাঁকগুলো কমে আসবে, এবং মিডিয়ার হেডলাইন আর বাস্তব জগতের গল্পের মধ্যে কোনো অমিল থাকবে না। কিন্তু সেই দিনটি আসার পথে আমরা কি যথেষ্ট চেষ্টা করছি? এই প্রচেষ্টা কেবল ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব।

By anirban