শীতের রাত। চারিদিকে কুয়াশা-মুড়মুড় করা বাতাস। ফেব্রুয়ারি মাস। ঢাকার কোনো এক মধ্যবিত্ত পাড়ায় আটকে থাকা এক পরিবারের গল্প বলবো আজ। কিছু ঘটনার মাধ্যমে, আপনি বুঝতে পারবেন কিভাবে জীবনটা মুহূর্তেই পাল্টে যায়। আমরা প্রায়ই মসজিদের মাইকে নামাযের আহ্বান শুনি, শান্তি খুঁজি। কিন্তু ওই রাতে, শান্তির সে সুর মিশে গিয়েছিলো ভয়ের বিষাদময় ধ্বনিতে।

“রাতের দিকে মসজিদের মাইকে কে যেন আমার বাবার নাম ধরে ‘আমিনুর রহমান’ বলে চিৎকার করতে লাগলো।” যখন সুমাইয়া বলছিলেন, তার চোখে ভয়ের ছায়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। সুমাইয়া আর তার পরিবারের জন্য সেই রাতটা ছিল একেবারে অন্যরকম। তাদের ঘরটা ছিলো ছোট কিন্তু শান্তির আধার। কয়েকটা ঘরের ছোট পরিবার, বাবা-মা আর দুই ভাইবোন।

সে রাতে, সুমাইয়া যখন ঘুমিয়ে ছিলো, তখন হঠাৎ করেই মসজিদ থেকে ভেসে আসা সেই চিৎকার তাকে জাগিয়ে দিলো। মসজিদের মাইকে এভাবে নাম ধরে কাউকে ডাকা, তার উপর হুমকি দেয়া, এটা ছিল ভাবনার বাইরে। সুমাইয়ার বাবা আমিনুর রহমান একজন সৎ মানুষ ছিলেন, এলাকার সবাই তাকে জানত। কিন্তু কে বা কারা এই হুমকি দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে, তা বুঝতে অসহায় হয়ে পড়লেন তারা।

যে মসজিদে প্রতিদিন প্রার্থনা করতেন, সেই মসজিদই যেন হয়ে উঠেছিল তাদের ভয়ের স্থান। অজানা আতঙ্কে রাত কাটাতে লাগলো সুমাইয়ার পরিবার। মাইকে প্রতিবন্ধক শব্দ শুনে রাগে ফেটে পড়েছিলো সুমাইয়া। “এটা কি ধরনের বর্বরতা?”, ভাবছিল সে। কিন্তু তার বাবার মুখে ছিলো নীরবতার ছায়া। তিনি জানতেন না এ নিয়ে কী করা উচিত।

পরের দিন সকালে, আমিনুর রহমান তার প্রতিবেশীদের সাথে আলোচনা করলেন। কিন্তু সেই হুমকির উৎস জানার কোন উপায় পাওয়া গেল না। অনেকেই বলল, হয়তো এটা কোনো পাগল কিংবা বখাটের কাজ। কিন্তু এটা কি আসলেই তেমন কিছু? নাকি এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে রয়েছে?

আসলে আমাদের সমাজে একধরনের মানসিকতা গড়ে উঠেছে, যেখানে সমস্যার মুখোমুখি না হয়ে তাকে এড়িয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করা হয়। অনেকেই ভাবলেন, হয়তো এতো সিরিয়াস কিছু নয়। কিন্তু সুমাইয়ার পরিবার এভাবে একের পর এক রাত কাটাতে পারছিল না, যেখানে প্রতিদিন কেউ একজন তাদের পরিবারের নাম নিয়ে মসজিদ থেকে হুমকি দিচ্ছে!

অবশেষে, তারা পুলিশের কাছে অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু পুলিশের কাছেও ছিলো অনেক প্রশ্নের পাহাড়। অভিযোগ নথিভুক্ত হলো ঠিকই, কিন্তু সেই হুমকির পেছনের মানুষগুলোর খোঁজ পেল না। রহস্যটা যেন আরো জটিল হয়ে উঠলো।

জীবনের এমন সময় আসে যখন আমাদের বিশ্বাস করতে হয়, কেউ আমাদের সহায় হবে। কিন্তু সুমাইয়ার পরিবারের সেই আশা যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছিলো। আতঙ্কের মাঝে কাটানো সময় তাদের সবার মনকে ভেঙে দিয়েছিলো। মসজিদ থেকে হুমকি দেয়া অবশ্যই নৈতিকতার বাইরে। এমনকি সেটি যদি মসজিদের কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যই হয়ে থাকে, তাহলেও সেই কাজটি অনুচিত। একটি পরিবারকে ভয়ে রাখতে এ ধরণের কাজ শুধু নিন্দনীয়ই নয়, এটি মানবাধিকারের বিরুদ্ধেও।

আমরা কি আসলেই জানি, আমাদের চারপাশে কত প্রকারের মানুষ বাস করছে? আমাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে কে বন্ধু, কে শত্রু তা বোঝা কি সম্ভব? যারা মনে করেন সামান্য একটা হুমকির কথা, তাদের মধ্যে অনেকেই আসলে জানেন না এর মানসিক চাপ কতটা ভয়াবহ হতে পারে। সেই রাতগুলোর কথা মনে পড়লে আজও সুমাইয়া ভয়ে কাঁপে। আমাদের সমাজকে এসব বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া এইসব ঘটনা বুঝতে এবং প্রতিরোধ করতে সচেতনতা জরুরি।

এই গল্প থেকে আমাদের শিখতে হবে, কখনও কাওকে অবহেলা না করা উচিত। প্রত্যেকেরই একটি নিরাপত্তার বলয় প্রয়োজন এবং এ প্রয়োজনকে সম্মান করা উচিত। আমাদের সমাজে অনেক অনুসন্ধানী চোখ থাকা প্রয়োজন, যা আমাদের সুরক্ষিত রাখবে। একজনের হুমকি দিয়ে যদি পুরো পরিবারকে ভয়ে রাখা যায়, তাহলে আমরা কোথায় যাচ্ছি? সবার আগে আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে। সুমাইয়ার পরিবার যেভাবে ভয়কে মোকাবিলা করেছে, এটাই আমাদের শিক্ষা দেয়, সাহস আর দৃঢ়তা কিভাবে ভয়ের বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারে। আমরা কি সেই সাহসিকতার গল্প শুনবো, নাকি এরকম গল্পকে শুধুই কল্পনা বলে অবজ্ঞা করব?