মনে আছে ২০২০ সালের মার্চের সেই শুক্রবার? হ্যাঁ বন্ধু, সেই দিনটিই ছিল লকডাউনের আগে শেষ শুক্রবার। যেন সারা পৃথিবীর সাথে আমরাও তখন এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। যদিও আমরা জানতাম না কীভাবে বা কতদিন ধরে এই পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হবে, তবুও আমরা চেষ্টা করেছিলাম সেই দিনগুলোকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখতে। তবে সেই শুক্রবারের ঘটনা আমার মনে এখনও স্পষ্ট, যেন সকালের রোদ্দুরের মতো যা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।

ঢাকার প্রায় সকল এলাকায় মন্দির আছে, বিশেষ করে পুরান ঢাকার মন্দির গুলোর কথা আলাদা করে বলতে হয়। সেদিন আমি ছিলাম সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ করেই দেখি মন্দিরের সামনে বেশ বড় একটি জটলা। প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে হয়তো, কিন্তু একটু পরে বুঝতে পারলাম যে মন্দিরের সামনে একদল লোক এক ধরণের তর্কে লিপ্ত। কাছাকাছি গিয়ে দেখি একজন বলছেন, “মন্দির বন্ধ করা যাবে না।” আরেকজন জবাব দিচ্ছে, “কারণ তো আর কিছু না, করোনা ভাইরাস!”

আমার মনে হয়েছিল যেন কোন সিনেমার দৃশ্য দেখছি। কিন্তু না, এটা ছিল বাস্তব। সেই সময় আমরা সবাই জানতাম যে বড় জমায়েত এড়িয়ে যাওয়াই হবে সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু ধর্মের সাথে যখন মানুষের অনুভূতি জড়িয়ে থাকে, তখন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। কিছু লোক মন্দিরে এসে প্রার্থনা করার পক্ষে ছিল, যখন বাকিরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে চাচ্ছিল। একে অপরকে গালাগালি করা আর হুমকি দেওয়া যেন দৈনন্দিন চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সেই তর্ক শুনছিলাম কিন্তু মনটা বড় অস্থির হয়ে উঠলো। কেননা, আমি দেখতে পাচ্ছিলাম কীভাবে একটা ছোট্ট অনিশ্চয়তা এত বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। যেন বিশ্বাস আর বাস্তবতার মধ্যে এক মহাযুদ্ধ চলছে। একপাশে বিশ্বাসের আশ্রয়, অন্যপাশে বাস্তবতার কঠোরতা। আর এই দুইয়ের মাঝে আমরা সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে আছি, হাত-পা গুটিয়ে।

যখন নিজেদের জীবনের কথা ভাবছিলাম, তখন মনে পড়েছিল আমার দাদির কথা। আমার দাদি ছিলেন ভীষণ ধার্মিক মানুষ। তিনি বলতেন, “প্রথমে মানুষকে ভালোবাসতে শিখো, তারপর উপাসনা করো।” এই বক্তব্যের গভীরতা এখন হয়তো আরও বেশি বুঝতে পারি। আমরা কি তবে ধর্মের চেয়ে মানবিকতার কথা না ভেবে পারি না? আমরা কি আর একটু সহনশীল হতে পারি না?

সে সময়ে মন্দিরের সামনে থাকা এক বৃদ্ধা মহিলার কথাও মনে পড়ছে। তিনি বলছিলেন, “করোনা কি আমাদের বিশ্বাস কেড়ে নিতে পারবে? না, তা কখনোই সম্ভব নয়।” তার কথায় যেন অন্ধ বিশ্বাসের ছোঁয়া ছিল, কিন্তু পাশাপাশি সাহসও ছিল। কিন্তু আবার অন্যদিকে, যে ভাইরাস আমাদের চোখে দেখা যায় না, তার জন্য কি আমরা নিজেকে অন্ধ করতে পারি?

অবশেষে, পুলিশের হস্তক্ষেপে সেই জটলা কিছুটা শান্ত হয়েছিল। কিছু লোক মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করেছিল, আর কিছু লোক ফিরে গিয়েছিল বাড়ি। কিন্তু সেই দিনটার স্মৃতি এখনও স্পষ্ট, যেন একটা ধাঁধার মতো, যার সমাধান এখনও হয়নি।

মহামারী আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। এই ঘটনা আমাদের দেখিয়েছে, কীভাবে ছোট্ট একটা ভাইরাস আমাদের পুরো জীবনকে পাল্টে দিতে পারে। এটি আমাদের শিখিয়েছে যে মানুষের জীবনের মূল্য সবচেয়ে বেশি, আর এই মূল্যকে রক্ষা করার জন্য আমাদের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

আজ, আমরা হয়তো সেই অবস্থার থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি, কিন্তু সেই দিনের স্মৃতি এখনও আমায় তাড়া করে। আমরা কি প্রকৃতপক্ষে সেখান থেকে কিছু শিখেছি? আমরা কি মানবিকতা আর বাস্তবতার মধ্যে সমতা করতে পেরেছি? এই প্রশ্নগুলোই হয়তো আমাদের ভবিষ্যতের পথ দেখাবে। আশা করি, আমরা সকলে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছি। তবে ভবিষ্যতের কোন শুক্রবার আমাদের সামনে কী নিয়ে আসবে, তা বলতেই পারি না। শুধু এটুকু বলবো, আমরা যেন সবকিছুর ওপরে মানবিকতাকে প্রাধান্য দেই। কারণ দিন শেষে, আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়ই তো আমরা মানুষ।

By purnima