আমরা সবাই জানি, ২০২০ সালটি আমাদের জীবনে কতটা বিশৃঙ্খলা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়েছিল। পুরো পৃথিবী যখন কোভিড-১৯ মহামারীর কবলে পড়ল, তখন মানুষজন যেন হঠাৎ করেই ঘরবন্দি হলো। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম ছিল না। আমাদের দেশেও লকডাউন ঘোষণা করা হলো, আর তখনই শুরু হলো এক অদ্ভুত জীবন। একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমারও জীবনে নতুন এক অধ্যায় শুরু হলো, যেখানে ঘরের বাইরে যেতে না পারা, প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকা, আর উৎসবগুলো ঘরে বসে কাটানোর মতো অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম।

২০২০ সালের সেই পহেলা বৈশাখ বা দুর্গাপূজা আমার জন্য একদমই ভিন্নপ্রকারের ছিল। পূজা মানেই আমাদের জন্য উৎসব, আনন্দ আর মেলামেশা। কিন্তু তখন ছিলো লকডাউন। ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তায় আর সাঁই সাঁই করে যাওয়া গাড়ির আওয়াজ শুনতে না পেয়ে মনটা খালি খালি লাগতো। পাড়ার মণ্ডপে গিয়ে সেজেগুজে বন্ধুদের সাথে দেখা করা, হইহুল্লোড় করা, এই সবকিছুই যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। মনে মনে ভেবেছিলাম, এ বছর আর কিছু হবে না। এর মধ্যে ফেসবুকে তো শুরু হয়ে গেল ভিন্ন ধরণের আলোচনা।

বিশেষ করে, যখন পূজার সময় আসে, তখন কোন কোন মহল থেকে শুনতে হলো, ‘তোমাদের উৎসব হারাম’। শুনতে একটু অবাক লাগতে পারে, কিন্তু এই কথাগুলোই ঘরে বসে বসে শুনতে হলো। বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা আমরা অনেক বলি, কিন্তু কোথাও কোথাও তা যেন ফাঁকি হয়ে যায়। আর সেই ফাঁকিটা যেন পরিষ্কারভাবেই চোখে পড়লো এই লকডাউনকালে। কেউ কেউ ভাবলে পারে, এই তো সামান্য কিছু মন্তব্য, কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে এই ধরনের মন্তব্য একে অপরের মধ্যে এক ধরণের দূরত্ব তৈরী করে যা আসলে খুবই দুঃখজনক।

তবুও, আশ্চর্যের বিষয় হলো, এমন কঠিন সময়ে প্রকৃত বন্ধুত্ব ও সুশীল সমাজের ছায়ায় আমার অভিজ্ঞতা একেবারে বিপরীত রকমেরও ছিল। অনেক বন্ধু এবং সহকর্মী যেন আরও বেশি কাছাকাছি হয়ে যায়। লকডাউনের মধ্যেও তারা ভিডিও কলের মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে অপরকে উৎসাহ দেয়। এসব মুহুর্তগুলো আমার মনে আশা ফিরিয়ে আনে যে, মানুষ আসলে ভালোবাসার এবং সম্প্রীতির মাধ্যমে সবকিছু জয় করতে পারে।

এবার আসি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের দিকে। আমাদের দেশে ধর্মীয় উৎসব মানেই এক ভিন্ন আনন্দ। এখানে ধর্মীয় উৎসব শুধু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নয়, বরঞ্চ তা পুরো সমাজকে একত্রিত করে। ঈদ, পূজা, বড়দিন কিংবা বৌদ্ধ পূর্ণিমার সময়ে প্রতিটা ঘর আলোকিত হয়ে ওঠে। তবে লকডাউনের সময় এই সবকিছু যেন দমবন্ধ হয়ে যায়। সরকারি নির্দেশ এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে বসেই পালন করতে হলো সব কিছু। তখনই বোঝা গেল আমাদের দেশে ধর্মীয় উদারতা এবং সম্প্রীতি কতটা দরকার।

এই লকডাউন আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমাদের সংস্কৃতির যে মেরুদণ্ড, যা একে অপরের প্রতি সহনশীলতা এবং ভালোবাসায় স্থির, সেটাই যেন আরও শক্তিশালী হলো। কিন্তু এখানেও কিছুটা প্রশ্ন থেকে যায়। ধর্মীয় অনুভূতির কারণে আমরা কি সবাই সমানভাবে আচরণ করতে শিখেছি? একে অপরের উৎসবকে আমরা কি যথাযথ সম্মান দিতে পারছি? নাকি পরিবেশের প্রভাবে আমরা আমাদের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হচ্ছি?

এই প্রশ্নগুলো যেন প্রতিদিন আমার মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আমার বিশ্বাস, আমাদের সমাজ শুধু সচেতনতার মাধ্যমেই এগিয়ে যেতে পারে। ‘তোমাদের উৎসব হারাম’ এই ধরনের মনোভাব পাল্টাতে হবে। এর পরিবর্তে আমরা যদি একে অপরের উৎসবের আনন্দে শামিল হতে পারি, তাহলে সমাজে সম্প্রীতির বাতাবরণ বৃথা যাবে না।

শেষে আমি বলতে চাই, লকডাউনের এই সময় আমাদের শিখিয়েছে, জীবনকে সহজভাবে নিতে হবে। উৎসবের আনন্দ শুধু মণ্ডপে নাচ গান করে নয়, বরঞ্চ তা অন্তরে ধারণ করতে হবে। ঘরে বসে হলেও যদি আমরা একে অপরের পাশে থাকতে পারি, তাহলে কোনো মন্তব্যই আমাদের বিভাজন করতে পারবে না। আমাদের দেশটি হোক ভালোবাসা আর সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সেই আশায় বুক বেঁধে বসে আছি।

By aditi