২০২০ সালের এপ্রিল মাসের সেই দিনগুলি, যেবার এক প্রকার অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে একত্রিত হতে হয়েছিল, তখনই আমাদের মধ্যে কিছু পরিবর্তন ঘটে যায়। মহামারি একটি অদ্ভুত সময় নিয়ে আসে। ঘরবন্দী জীবন, বন্ধ দোকানপাট, এবং নীরব শহর কিন্তু এর মধ্যেও কিছু বিষয় পরিবর্তন হয়নি একটা বিষয় যা আমাদের মনকে ক্ষুণ্ন করে যায় তা হল ধর্মীয় অবকাঠামোর উপর আক্রমণ এবং উস্কানি। মন্দির এবং বিহারে মানুষের উপস্থিতি কমে গেলেও, হুমকি কিন্তু সত্যিই কমেনি। বরং, মহামারির সময়েই এটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তোমরা নিশ্চয়ই মনে করতে পারো, মহামারির সূচনালগ্নে কেমনভাবে লকডাউনের কারণে ধর্মীয় স্থানগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। শুধু মন্দির বা বিহার নয়, মসজিদ, গির্জা সবই এমন অবস্থায় পড়েছিল। কিন্তু মন্দির বা বিহারের প্রতি যে দৃষ্টিকোণ থেকে উস্কানি চলছিল, তা কিন্তু একদমই থেমে থাকেনি। উল্টো, এই নিঃশব্দতাই যেন কিছু মানুষকে আরও সাহসী করে তোলে। প্রায়শই আমরা শুনতে পেয়েছি কিভাবে নির্জন মন্দির বা বিহারে হামলা হয়েছে কিংবা উস্কানি দেওয়া হয়েছে।
এটা কি শুধুই ঘৃণা থেকে, নাকি এর পিছনে আরও কোন গভীর কারণ রয়েছে? একদিকে ধর্মীয় সহনশীলতার কথা বলা হয়, অন্যদিকে এই ঘটনা আমাদেরকে একেবারে বিপরীত বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়। যেসব জায়গায় মানুষের সমাগম নেই, সেখানে হামলা বা উস্কানি দেওয়া হয় শুধুমাত্র একদল মানুষের মনোজগতের অস্থিরতা থেকে। তবে এ কথা অস্বীকার করবো না যে, এ ধরনের ঘটনা আমাদের মনের ভিতরে একধরনের হতাশা এবং নিরাপত্তার অভাব তৈরি করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচ্য। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে যখন সংখ্যালঘু ধর্মীয় স্থাপনা আক্রান্ত হয়, তখন এটি শুধু একটি স্থানীয় ইস্যু নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু হয়ে ওঠে। সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এর প্রতিক্রিয়া জানায়, কিন্তু তা যথেষ্ট কি? এই উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।
মহামারির সময়কালে যখন সরকারি ভাবে নির্দেশনা ছিল যে সবাই ঘরে থাকবে, তখন সরকার কতটা সচেষ্ট ছিল ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে? সাধারণ জনগণের কতটুকু মনোযোগ ছিল এই বিষয়ে? হয়তো মহামারির দুশ্চিন্তায় অধিকাংশ মানুষ নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত ছিল, কিন্তু এই সময়েই যেন এসব ঘটনা চুপিচুপি ঘটেছিল। অথচ এই বিষয় নিয়ে সচেতনতা খুবই জরুরি।
এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়? প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলো এসব স্থাপনার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া। দ্বিতীয়ত, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার যেন তারা এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারেন। শিক্ষা এবং সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা যদি মানুষকে বোঝাতে পারি যে সহনশীলতার মধ্যেই আমাদের ধর্মীয় ঐক্য, তাহলে হয়তো এ ধরনের উস্কানিমূলক ঘটনা কমে আসবে।
মন্দির বা বিহারে উস্কানি দেওয়া শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। যখন একটি সমাজের একটি অংশ নিজেদের ধর্মীয় অবকাঠামো নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে, তখন তা পুরো সমাজের উপর প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদেরকে সকল ধর্মের মানুষকে একত্রে কাজ করতে হবে, যেন আমরা সত্যিকারের সহনশীল একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি। মহামারির পরেও, আমাদের এই দায়িত্বকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
তাহলে কি এই সমস্যার কোনো সমাধান নেই? অবশ্যই আছে, যদি আমরা সত্যিকার অর্থে একসাথে কাজ করতে পারি। শুধুমাত্র ধর্মীয় স্থাপনা নয়, আমাদের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। সহনশীলতা এবং ঐক্যের মাধ্যমে আমরা সমাজকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারি। আপনি কি মনে করেন, আমাদের সমাজ কখনও এই স্থানে পৌঁছাবে যেখানে সব ধর্মের মানুষ শান্তি এবং সম্প্রীতির সাথে বাস করতে পারবে?
