বাঙালিরা চায়ের কাপে ঝড় তোলায় সিদ্ধহস্ত। যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা থেকে শুরু করে, তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া আমাদের রক্তে মিশে গেছে। ঠিক এমনই এক সন্ধ্যায়, চায়ের দোকানে বসে আমরা কয়েকজন বন্ধু আলোচনায় মেতে উঠেছিলাম এক এমন বিষয় নিয়ে, যা আমাদের সমাজে খুবই প্রচলিত কিন্তু সাধারণত আলোচনার বাইরে থাকে। সেটা হলো মেয়েদের উপর হিজাব পরার চাপ এবং না পরলে তাদের দিকে আসা হুমকির বিষয়ে।
আপনি হয়তো ভাবছেন, হিজাব পরা তো ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়, এখানে চাপের বা হুমকির কী আছে? কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজের কিছু অংশ এখনো হিজাবকে নারী চরিত্রের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখে। আর এখানেই শুরু হয় সমস্যার সূত্রপাত। মেয়েদের যদি হিজাব পরতে বলা হয় আর তারা যদি তা না পরতে চায়, তাহলে তাদের কি স্বাধীনতা নেই? কয়েকজন নারীকে আমি নিজেই চিনি, যারা তাদের পছন্দের পোশাক পরতে পারেন না শুধুমাত্র পরিবারের বা সমাজের ভয়ে।
একদিন শ্যামলা রঙের নিশা নামের এক মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো। নিশা ছিলো এক মেধাবী শিক্ষার্থী, যার স্বপ্ন ছিলো দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা। তার পছন্দের পোশাক ছিলো জিন্স আর টি-শার্ট। কিন্তু বাড়িতে এ নিয়ে একাধিকবার ঝগড়া হওয়ার পর, সে বাধ্য হয়েছিল হিজাব পরতে। নিশার মুখে আমি যে কষ্টের ছাপ দেখেছিলাম, তা আজও ভুলতে পারিনি। সে বলেছিল, “আমি যদি হিজাব পরতে না চাই, তাহলে কী আমি খারাপ মেয়ে? কেন আমাকে এইভাবে বিচার করা হয়?” নিশার প্রশ্নগুলো আমার মনের ভেতরে ঘুরপাক খেতে লাগল। সত্যি, কেন মেয়েদের এইভাবে বিচার করা হয়?
আমাদের সমাজের কিছু অংশে এখনো মেয়েদের হিজাব না পরার জন্য নানা রকমের হুমকি দেওয়া হয়। যেমন, ‘হিজাব না পরলে তোমার পরিণতি খারাপ হবে’ কিংবা ‘তুমি যদি হিজাব না পরো, তাহলে তুমি ভালো মেয়ে নও’। এমন সব কথা শোনার পর মেয়েরা নিজেদের স্বাধীনতা হারায়, তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়। তারা ভাবতে শুরু করে, তাদের কোনো মূল্য নেই যদি তারা সমাজের নির্ধারিত নিয়ম মেনে না চলে।
এই ধরনের পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়, সামাজিক মাধ্যমেও এ ধরনের হুমকি ও সমালোচনা দেখা যায়। অনলাইনে মেয়েদের হিজাব না পরার জন্য নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়। কিছু মানুষ নিজেদের ধর্মের রক্ষক ভেবে এ ধরনের কথা বলে বেড়ায়, কিন্তু তারা কি বোঝে যে তারা কাকে এবং কিভাবে আঘাত করছে? হয়তো বোঝে কিন্তু তাতে তাদের কিছু যায় আসে না।
আমার এক সহপাঠী, রেবেকা, তার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিল আমাদের সাথে। তার কথাটা ছিল অনেকটা এ রকম, “আমি জানি, হিজাব পরা আমার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। কিন্তু যখন আমার নিজের পরিবারই আমাকে হিজাব পরতে বাধ্য করে এবং না পরলে নানা ধরনের কথা শোনায়, তখন আমি নিজেকে অসহায় মনে করি।” রেবেকার এই কষ্টের অনুভূতি অনেক মেয়ের সাথেই মিলে যায়। তাদের প্রশ্ন, কেন তাদের নিজেদের পছন্দের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই?
হিজাব পবিত্রতা এবং ধর্মীয় দায়িত্বের প্রতীক হতে পারে; তবে এটি মানসিক চাপ কিংবা হুমকির মাঝে পড়ার বিষয় নয়। একটি মেয়ে যদি হিজাব পরতে চায়, তাহলে সেটি তার ব্যক্তিগত পছন্দ হওয়া উচিত, কোনো চাপের কারণে নয়। আর যদি সে না পরতে চায়, তার এই সিদ্ধান্তকেও শ্রদ্ধা করা উচিত। তার মূল্যায়ন তার কাজ, মেধা এবং মানবিক গুণাবলির ভিত্তিতে হওয়া উচিত, পোশাকের ভিত্তিতে নয়।
আমাদের সমাজে আজকের এই যুগে এমন প্রত্যাশা করা কি ভুল যে মেয়েরা কি পরবে, সেটি তারাই ঠিক করবে? যারা না বুঝেই হুমকি দেয়, তাদের কি এই প্রশ্নের উত্তর জানা আছে? আমরা কি একদিন এমন সমাজ দেখতে পাবো, যেখানে মেয়েরা তাদের পছন্দের পোশাক পরতে পারবে এবং তাদের কোনো হুমকির সম্মুখীন হতে হবে না? আপনার কি মনে হয় না, এই প্রশ্নগুলো আমাদের সামনে এখন সময়ের দাবি?
শুধুমাত্র পোশাকের কারণে মেয়েদের পক্ষপাতিত্বের শিকার হতে হবে না। তাদের ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং স্বাধীনতাকে সম্মান করা উচিত। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীদের অধিকার রক্ষা করা প্রয়োজন। আমরা সকলেই যদি একসাথে কথা বলি, প্রতিবাদ করি, তাহলে হয়তো একদিন আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে কোনো মেয়ে তার পছন্দের জন্য হুমকির সম্মুখীন হবে না। এই পরিবর্তনটি শুধু মেয়েদের জন্য নয়, পুরুষদের জন্যও, কারণ সমতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমাজেই প্রকৃত উন্নতি সম্ভব। আপনার কি মনে হয়, আমরা কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?
