বাংলাদেশের ফেব্রুয়ারির কথা আসলে প্রথমেই মনে পড়ে ভাষার মাস, আমাদের গৌরবের মাস। কিন্তু এই ফেব্রুয়ারিতেই যখন শুনি চার্চ, বিহার, মন্দিরে ছোট ছোট হামলার লম্বা তালিকা তৈরি হচ্ছে, তখন আমাদের ঐতিহ্যের ওপর একটা কালো ছায়া যেন ফেলে দেয়। এখানে আমরা সেই অন্ধকার সময়টাকে একটু আলো ফেলে দেখার চেষ্টা করব।

আপনারা জানেন, আমাদের দেশটা ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য বিখ্যাত। এখানে আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এক সাথে বসবাস করি, এক সাথে উৎসব পালন করি। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যা আমাদের সেই সম্প্রীতিকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। ফেব্রুয়ারিতে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা ভাবতে বাধ্য করে আমরা কি সেই সম্প্রীতির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি, নাকি পেছনের দিকে টানছি।

ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা কোনো নতুন বিষয় নয়, তবে যখন এগুলো ছোট ছোট হামলার আকারে ছড়িয়ে পড়ে তখন এর প্রতিক্রিয়া প্রবল হয়। এ ধরনের হামলা যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় স্থাপনায় হতো, তাহলে হয়তো আমরা সেটাকে ব্যতিক্রমী ঘটনা বলে এড়িয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু যখন চার্চ, বিহার, মন্দির একসাথে এই ধরনের হামলার শিকার হয়, তখন আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে যে এর পেছনে কারা আছে এবং তাদের উদ্দেশ্য কী।

আমি নিজে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম, তবে আমার মনে হয় ধর্মীয় সহিষ্ণুতা একটি দেশের উন্নতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মের লোকজন একসঙ্গে কাজ করে, ব্যবসা করে, এবং একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকে। কিন্তু যখন দেখি এই হামলাগুলো, তখন মনে হয় কোথাও কিছু ভুল হচ্ছে। আমাদের শিশুদের যদি আমরা সহিষ্ণুতা না শিখাই, তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আরো বাড়বে।

এই হামলাগুলো অনেক সময় ছোট খাটো মনে হতে পারে কিন্তু এর প্রভাব বিশাল। একবার ভাবুন, যদি কোনো গীর্জা বা মন্দিরে হামলা হয়, সেই কমিউনিটির সদস্যরা কেমন ভীতির মধ্যে দিন কাটায়। তাদের বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানে এসব হামলা। অথচ এই বিশ্বাসই তো আমাদের একতাবদ্ধ রাখে। আমাদের নেতারা যখন এই হামলাগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান, তখন সাধারণ জনগণের মাঝে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়। কিন্তু শুধু প্রতিবাদ করলেই তো হবে না, এর পেছনের কারণগুলোও খুঁজে বের করতে হবে।

একটা দেশের সভ্যতার মাপকাঠি হলো তার সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ। কিন্তু যখন তাদের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোও সুরক্ষিত থাকে না, তখন সেই সভ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চয়ই এই ধরনের হামলাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে এটা শুধু পুলিশের কাজ নয়, আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমরা যদি নিজেরাই আমাদের দায়িত্ব না বুঝি, তাহলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কতটুকু করতে পারবে?

এই হামলাগুলোর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। হয়তো কোনো গোষ্ঠী চাইছে আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে, হয়তো কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। কিন্তু যে কারণেই হোক, আমাদের সম্প্রীতির বন্ধন এত সহজে ভাঙা উচিত নয়। আমাদের ইতিহাস বলে আমরা একসঙ্গে থাকতে জানি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সেই ঐক্যেরই উদাহরণ। সেই ঐক্যকে যদি আমরা ছোট ছোট হামলার জন্য হারিয়ে ফেলি, তাহলে সেটা হবে আমাদের পরাজয়।

ব্লগের এই পর্যায়ে এসে বলতে চাই, এই হামলাগুলো আমাদের জন্য একটা জাগরণ। আমাদের নিজেদেরকেই নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। চার্চ, বিহার বা মন্দিরের নিরাপত্তা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমাদের সমাজের বিজ্ঞ ব্যক্তিদের এ সম্পর্কে আরো বেশি কথা বলা উচিত। সমাজের প্রতিটি মানুষকে বোঝাতে হবে যে, ধর্মের নামে কাউকে আঘাত করা কখনো সঠিক হতে পারে না। আমাদের স্কুল-কলেজগুলোতেও ধর্মীয় সম্প্রীতির পাঠ পড়ানো উচিত।

এই ধরনের হামলা থেকে কেউই মুক্ত নয়। আজ হয়তো এটা চার্চ বা মন্দিরে, কাল এটা আমাদের মসজিদেও হতে পারে। তাই এই বিষয়ে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। আমরা যদি আমাদের নিজের অবস্থান থেকে সচেতন থাকি, তাহলে এই ধরনের হামলাগুলো রোধ করা সম্ভব।

শেষে একটা প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, আমরা কি সত্যিই সেই বাংলাদেশ চাই যেখানে ধর্মীয় সম্প্রীতি নেই, যেখানে সবার জন্য সমান নিরাপত্তা নেই? উত্তরটা আপনারাই দিন। আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ আমাদেরই হাতে। আসুন, আমরা সবাই মিলে সেই ভবিষ্যৎ গড়ি যেখানে কোনো ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা হবে না, যেখানে সবাই শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।

By ishita