আপনাদের মনে আছে সেই দিনগুলো, যখন আমরা ছোটবেলায় বৈশাখের প্রথম দিনে সেজেগুজে বের হতাম? পহেলা বৈশাখ আমাদের জন্য শুধু একটি দিন নয়, এদিন জীবন্ত রঙে রাঙানো এক সামাজিক উৎসব। তবে সাম্প্রতিক কিছু বছরে লক্ষ্য করছি, যখনই পহেলা বৈশাখ ঘনিয়ে আসে, তখনই কিছু গোষ্ঠী আমাদের প্রিয় সংস্কৃতিচর্চার বিরুদ্ধে ‘ধর্মবিরোধী’ তকমা লাগানোর চেষ্টা করে। কেন যেন এটাই তাদের কাছে এক ধরনের মিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ আমরা এই বিষয়টা একটু খুঁটিয়ে দেখবো।

পহেলা বৈশাখ তো সেই সময় থেকেই চলে আসছে যখন আমাদের এই ভূখণ্ডে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করতো। এই দিনটায় সকল ধর্মের মানুষ একত্র হয়ে নতুন বছরের সূচনার আনন্দ উদযাপন করতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী এই উৎসবকে বেঁধে ফেলতে চাইছে ধর্মের গণ্ডিতে। তাদের মতে, এটা একটি ‘হিন্দুয়ানি’ সংস্কৃতি। কিন্তু সত্যিটা হলো, পহেলা বৈশাখ ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের সর্বজনীন সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাদের বাড়িতে পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল নতুন জামাকাপড়, পান্তুয়া-মিষ্টি, আর রঙিন আলপনার বাহার। মনে আছে, আমাদের পাড়ার বড় আম গাছটার নিচে আল্পনা আঁকা হত, আর সেখানে আমরা সবাই মিলে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতাম। কিন্তু এখন দেখি, অনেকেই এই দিনটিকে এড়িয়ে চলে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একটা দ্বিধা তৈরি হয়েছে। এটা সত্যি দুঃখজনক। আমাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখা কি অপরাধ?

আমি মনে করি, এই ধরণের চর্চা বন্ধ করা আমাদের সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আমরা যদি আমাদের ঐতিহ্যকে ভুলে যাই, তবে আমরা আমাদের সত্তাকেই হারাবো। পহেলা বৈশাখ তারিখের হিসেবে নতুন বছরের শুরু হলেও এটি অনেক গভীর মহত্ব বহন করে। এদিনের চারুকলা ইন্সটিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু বাংলাদেশের জন্য বিশেষ নয়, ইউনেস্কোও এটাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাহলে আমরা কেন এত দ্বিধা করি?

কিছু মানুষ মনে করে, সংস্কৃতি মানে তাদের ধর্ম থেকে বিচ্যুতি। কিন্তু আমি বলবো, আমাদের সংস্কৃতি আমাদের ধর্মীয় সত্তারই একটি সম্প্রসারণ। পহেলা বৈশাখ আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এক ছিলাম, এক আছি এবং এক থাকবো। আমাদের দরকার সকলের সমর্থন, যারা মনে করেন পহেলা বৈশাখ আমাদের সবার।

আমি বুঝতে পারি ধর্মভীতি অনেক সময় আমাদের উপর হুমকির মতো হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমাদের জানা উচিত ধর্ম আর সংস্কৃতি এক নয়। ধর্ম আমাদের বিশ্বাসের জায়গা, আর সংস্কৃতি আমাদের জীবনযাত্রার। দুইয়ের মধ্যে সংযোগ থাকতে পারে, কিন্তু তারা একসঙ্গে মিশে যায় না। আমরা যদি তাদের আলাদা করতে না পারি, তাহলে এই বিপদ শুধু আমাদের নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও সাংস্কৃতিক শিকড় ছিন্ন করবে।

আমাদের দরকার এই বোঝাপড়ার উপর গুরুত্ব দেয়া, যেখানে ধর্মকে আমরা ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, আর সংস্কৃতি আমাদের সমাজের একটি অংশ হিসেবে। সংস্কৃতিচর্চা কোনো রকমে ধর্মবিরোধী নয়। এটি আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের ইতিহাস এবং আমাদের গর্ব।

আমি এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে পহেলা বৈশাখ ধর্মীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে আসবে। যেখানে আমরা সবাই একসঙ্গে মিলে আনন্দ ভাগাভাগি করবো, একে অপরের সংস্কৃতি সম্মান করবো। আমাদের আগামী প্রজন্ম যেন এই উৎসবের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারে, সেজন্য আমাদের এখনি দায়িত্ব নিতে হবে।

তাহলে কি আমরা এই পরিবর্তন আনতে পারবো? আমরা কি পারবো আমাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে? এ প্রশ্নগুলো আমাদের হৃদয়ে গেঁথে রাখতে হবে। কারণ পহেলা বৈশাখ আমাদের বিগত বছরগুলোর মতো আবার নতুন করে শুরু করা শেখায়, আর এই নতুন শুরু আমাদের সংস্কৃতির আরো মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।